Wednesday, July 6, 2022

৭। লুপ্তধন

 বিশে এপ্রিল, পনেরোশো ছাব্বিশ। পানিপথের প্রথম যুদ্ধের আগের রাত্রি।

“চম্বল, ঠিক আছিস? চম্বল?”

চম্বল আওয়াজটার দিকে মাথা ঘোরায়। বিন্দু বিন্দু আলোগুলোর সামনে একটা অন্ধকার অবয়ব।

“পল্টনদা?”

“হ্যাঁ।”

“আমার মুখে কে ঘুষি মারলো?”

হাসির শব্দ। “কেউ ঘুষি মারেনি। তুই পড়ে গেছিলি মুখ থুবড়ে।”

চম্বল চোখ কচলায়। আস্তে আস্তে সব পরিস্কার হচ্ছে। পল্টনের মুখ দেখতে পাচ্ছে এখন। আলোর বিন্দুগুলো আকাশের তারা, এখন বুঝতে পারে।

চম্বল উঠে বসে। প্রত্যুষের গলা পাওয়া যাচ্ছে, নিচু গলায় কথা বলছে, বোধহয় অহনার সাথে। চম্বল তাকিয়ে দেখে আশপাশে। ওরা একটা মাঠের মধ্যে বসে আছে। বেশ অন্ধকার, আকাশে চাঁদ নেই বলেই বোধহয়। একটু মেঘ আছে মনে হয়।

“সব গুলিয়ে গেছিলো,” চম্বল বলে।

“টাইম ট্রাভেলে ওরকম হয়,” পল্টন জানায়। “তাছাড়া তোর মাথায় লেগেছিলো।”

“এটা কোন জায়গা?”

“শুধু কোন জায়গা নয়, কোন সময় সেটাও জিগেস কর,” প্রত্যুষ কথা শেষ করে চম্বলের পাশে এসে ঘাসের ওপর বসে। “আগের বার জায়গা ঠিক ছিল, সময়টা গন্ডগোল হয়ে গেছিলো। পানিপথেই ছিলাম, কিন্তু প্রথম যুদ্ধে পাঠাতে গিয়ে মেশিনটা ভুল করে তৃতীয় যুদ্ধে পাঠিয়ে দিয়েছিলো। সতেরোশো একষট্টি সালের চোদ্দই জানুয়ারিতে। তাই জন্য ঠান্ডা লাগছিলো। আমরা যখন পৌঁছেছিলাম তখন যুদ্ধ প্রায় শেষ।আফগান রাজা আহমেদ শাহ আবদালির সৈন্যবাহিনী মারাঠা বাহিনীকে যুদ্ধে হারিয়ে দিয়েছে, কিন্তু মারাঠাদের বাগে আনতে পারেনি। হেরে গিয়েও মারাঠারা আক্রমন চালিয়ে যাচ্ছিলো। কিছু মুঘল সৈন্য জঙ্গলে লুকিয়েছিলো নিশ্চয়ই আর মারাঠারা তাদের পিছু নিয়েছিলো। আমরা পড়ে গেছিলাম তার মধ্যে। কিছু মুঘলরা মারাঠাদের সমর্থন করেছিলো আর কেউ কেউ আবদালিকে সমর্থন করেছিলো। তাইজন্যই ওই লোকগুলো জানতে চাইছিলো কোন মুঘল বাহিনী।”

“মেশিন এরকম ভুল করে? এতো সাংঘাতিক বিপদের কথা।” চম্বল বুঝতে পারেনা প্রত্যুষ ব্যাপারটাকে এত হালকা ভাবে নিচ্ছে কিকরে। আরেকটু হলে এক দল মারাঠা সৈন্যর হাতে কচুকাটা হতে হতো।

“জানি। কিন্তু কোনো সমাধান নেই,” প্রত্যুষ দুঃখের সাথে জানায়। “এরকম মাঝে মাঝে ঘটে। আসলে মেশিনটা স্থান আর কাল - এই দুটোকে একসাথে সবসময় খুব নিখুঁত ভাবে নির্ণয় করতে পারে না। একটা যত ঠিক হয়, আরেকটা তত ভুল হয়ে যায়। সবসময় নয়, কিন্তু মাঝে মাঝে হয়। একবার আমরা যাচ্ছিলাম উনিশশো বাহাত্তর সালের কলকাতায়। ভুল করে পাঠিয়ে দিয়েছে সতেরশো বাহাত্তর সালে। সেই যুগের একটা ভিড় রাস্তায় আমরা দিন দুপুরে ফুল-ফুল ছাপ হাফ শার্ট, বেল বটম প্যান্ট আর সানগ্লাস পড়ে হাজির হয়েছি।  অবস্থাটা ভাব! পালাবার পথ পাই না। তার মধ্যে এই পল্টনটা আবার এক জমিদারের লাঠিয়ালের সাথে ঝামেলা বাধিয়ে বসলো।”

“আমার দোষ?” পল্টন প্রতিবাদ করে। “ওই লোকটাই তো তেড়ে আসছিলো।”

প্রত্যুষ চম্বলের দিকে তাকিয়ে বলে, “তুই যদি কারুর দিকে আঙ্গুল তুলে বলিস, ‘ওই দেখো কিরকম তেলমাথা চকচকে ভুড়ি!’ তাহলে  সে রেগে যাব না?”

“আমরা কি এখন এখানে অপেক্ষা করবো?” মিস্টার চেঙ্গিস জিজ্ঞাসা করেন।

“তাই তো মনে হচ্ছে,” পল্টন বলে। “আপনি ঘুমোনোর কথা ভাবছেন?”

“না, না, অপেক্ষা করবো না,” প্রত্যুষ বলে। “একটু দম নেওয়ার জন্য বসা হয়েছিলো। এবার মুঘল শিবিরে যেতে হবে। দেরি করা উচিৎ হবে না।”

চম্বল উঠে দাঁড়িয়ে  কামিজ আর পাজামা থেকে ঘাস ঝাড়ে। বলে, “কোন দিকে যাবো?”

“ঐ যে আলো দেখা যাচ্ছে, ওটাই মুঘল শিবির। অন্তত অহনার হিসাবে তাই।”

তা বটে আলো দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের বুক থেকে রাতের বেলায় দূরের তীরের আলো যেরকম লাগে, সেরকম অন্ধকার মাঠ পেরিয়ে দূরে অগনিত আলোর মেলা।

“অপর পক্ষ কোথায়?” চম্বল জিজ্ঞাসা করে।

প্রত্যুষ এদিক ওদিক তাকায়। বলে, “তাই তো, ইব্রাহিম লোদির ছাউনি কোথায়?”

“বোধহয় ঐ পাঁচিলের ওপারে,” পল্টন বলে।

“পাঁচিল?” প্রত্যুষ চোখ কুঁচকে অন্ধকারের মধ্যে দেখার চেষ্টা করে। বলে, “তাই তো! ওটা কি?”

অন্ধকারের মধ্যে আবছা বোঝা যায় যে মাঠের মধ্যে যেন একটা দেওয়াল তোলা আছে। একেবারে এদিক থেকে ওদিক।

“লোকে পাঁচিল টপকে টপকে যুদ্ধ করবে?” চম্বল অবাক হয়।

“তা কিকরে হবে?” প্রত্যুষ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে। “বেশ বড় পাঁচিল মনে হচ্ছে। অদ্ভুত ব্যাপার।”

“ওদিক দিয়েই যেতে হবে কি?”

“খানিকটা এগোই, তারপর দেখছি। আমার হিসাব মত যে জায়গাটায় আকবর কে দেখেছিলাম সেটা ছাউনির ওপারে। বড্ড অন্ধকার। বলেছিলাম বিকেলবেলায় পৌঁছতে চাই, তা না অন্য যুদ্ধের বিকেলে পৌঁছে দিলো।” প্রত্যুষ কোমরবন্ধনীটা কষে বাঁধে। “চল এবার। মিস্টার চেঙ্গিস, রেডি?”

সবাই নিঃশব্দে এগোয়। একসময় প্রত্যুষ হাত তুলে সবাইকে থামায়। পাজামার পকেট থেকে একটা সরু দূরবীন বার করে চোখে লাগায়। তারপর দূরবীনটা একে একে সবার হাতে দেয়। চম্বল চোখে লাগিয়ে প্রথমে শিবিরটা দেখে। আলোগুলো যে আগুন সেটা আগেই বোঝা যাচ্ছিলো। এখন তার সামনে লোকজনের হাঁটা চলা দেখা যায়। তাঁবুগুলোর রঙ হয় সাদা নয় হলুদ।।

পাঁচিলের দিকে দেখার চেষ্টা করে চম্বল। কিন্তু সেদিকে বড়ই অন্ধকার। আগুন তো দূরের কথা, একটা মশাল অব্দি দেখা যাচ্ছে না।

পাঁচিলটা এক মানুষ উঁচু হবে। তার থেকে লম্বা লম্বা কিসব বেরিয়ে আছে।

“গাছের গুঁড়ি নাকি ওগুলো?” চম্বল দূরবিনটা নামিয়ে জিজ্ঞাসা করে। “পাঁচিলের গায়ে ওগুলো কি হেলান দিয়ে রেখেছে?”

“মনে হচ্ছে ঠেকনা। পাঁচিলটা নতুন বানিয়েছে হয়তো, গাছের গুঁড়ি দিয়ে সাপোর্ট দিচ্ছে।” প্রত্যুষ বলে। তারপর সবার দিকে ফিরে বলে, “ছাউনির পিছনে যেতে হলে আমাদের ছাউনিকে ঘুরে যেতে হবে। মধ্যিখান দিয়ে না যাওয়াই ভালো। সেক্ষেত্রে একটা উপায় হচ্ছে ছাউনির বাঁদিক দিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ আমরা যেমন এগোচ্ছি সেরকমই এগোবো এবং পাঁচিলটাকে বাঁদিকে রেখে পাঁচিল ও ছাউনির মধ্যের খালি জায়গাটা দিয়ে সোজা পেছনে গিয়ে পৌঁছবো। অপর রাস্তাটা ছাউনির ডানদিক দিয়ে। কিন্তু তার মানে পুরো শিবিরটা ঘুরে যাওয়া। এই অন্ধকারে সেটা বিপজ্জনক হতে পারে। সুতরাং আমরা সোজাই যাবো। অন্যান্য সৈন্যদের সাথে মোলাকাত হলে চুপচাপ ব্যস্ত ভাব করে কাটিয়ে যাবো।”

প্রত্যুষ এগোয়, পেছনে চম্বল আর মিস্টার চেঙ্গিস আর তাদের পেছনে পল্টন।

পাঁচিলটা যত কাছে আসতে থাকে তত অদ্ভুত দেখতে লাগে। ঠিক দেওয়াল বলে যেন মনে হয় না। মধ্যে মধ্যে ফাঁক আছে যেন।

“গরুর গাড়ি,” প্রত্যুষ বলে ওঠে। “পাঁচিল নয় ওটা। গরুর গাড়ির সারি।”

এত গরুর গাড়ি কোনোদিন দেখেনি চম্বল। গরু গুলোকে খুলে শুধু গাড়িগুলো সার দিয়ে দাঁড় করানো রয়েছে। যতদূর চোখ যায়। প্রতি দুটো গাড়ির মধ্যে একটা করে কাঠের গুঁড়ি।

“আরাবা,” মিস্টার চেঙ্গিস বলেন। “ওই গাড়িগুলোর নাম আরাবা।”

এইবার গাড়িগুলোর চেহারা পরিস্কার হচ্ছে। গোল ছই দেওয়া গরুর গাড়ি। একটার পর একটা শেকলের মত লাগানো আছে। আর তার মাঝে মাঝে...

চম্বলের চোখ কচলায়। হ্যাঁ, ঠিকই দেখছে। কামান। প্রতি দুটো গরুর গাড়ির ফাঁকে একটা করে কামান।কোনো গাছের গুঁড়ি নয়।

এখন গাড়িগুলো ওদের বাঁদিকে। ডানদিকে একটু দূরেই শিবিরের প্রথম তাঁবু।

“প্রত্যুষদা!” পল্টন পেছন থেকে চাপা গলায় বলে ওঠে। “অনেক লোক।”

“দেখেছি। চুপ করে এগো। কেউ দাঁড়াবি না।”

দেখেছে চম্বলও। প্রতিটা কামানের পাশে একটা করে লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাদের পোশাক আপাদমস্তক কালো। অন্ধকারের মধ্যে মিশে গেছে লোকগুলো।

নিঃশব্দে এগোতে থাকে চারজনে। বাঁদিকে একটার পর একটা গাড়ি, একটার পর একটা কামান আর ডানদিকে সারি সারি তাঁবু। তাঁবুর মধ্যে মধ্যে অগ্নিকুন্ড। রান্না হচ্ছে তার ওপরে, গন্ধ ভেসে আসছে সেঁকা মাংসের। লোকজন আগুন ঘিরে বসে আছে।

প্রত্যুষ একটু আস্তে হয়ে যায়। একটা ঘোড়া আসছে উল্টোদিক থেকে পাঁচিল ঘেঁষে। চম্বলের হাত চলে যায় ওর তলোয়ারের মুঠোয়।

কিন্তু নিস্প্রয়োজন। ঘোরসওয়ার ওদের দিকে তাকায়ও না। তার দৃষ্টি শুধুই গাড়ির প্রাচীরের দিকে।

“রক্ষণ পরীক্ষা করতে বেরিয়েছে,” পল্টন বলে।

“রক্ষণ?” প্রত্যুষ বলে। “এটাই আক্রমন। লোদির সৈন্য এগোতে গেলেই কামানের গোলার মধ্যে পড়বে। আর কামানগুলো যেভাবে রেখেছে, ওদিক থেকে বুঝতেই পারবে না। ভাববে শুধু গরুর গাড়ি রেখে পথ আটকানোর চেষ্টা করেছে। এইভাবেই বাবর অত কম সৈন্য নিয়ে জিতেছিলো, বুঝলি?”

অবশেষে শেষ হয় গুরুর গাড়ির লাইন। সামনে একটু খোলা জায়গার পর কিছু ঝোপঝাড় আর কয়েকটা গাছ। প্রত্যুষ একবার শিবিরের দিকে দেখে। সেখানে সৈন্য সামন্ত অনেক। বাবরের তাঁবু কোনদিকে হতে পারে বোঝা শক্ত।

“আমরা কিছুক্ষণ ঐ ঝোপঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকবো,” প্রত্যুষ বলে। “তারপর এদিকে লোকজনের ভিড় একটু কমলে আমার ম্যাপটা ফলো করে ঠিক জায়গাটায় পৌঁছে অপেক্কা করবো।”

“বনে বাদাড়ে বসে থাকতে হবে?” পল্টন বিরস গলায় জানতে চায়।

“হ্যাঁ। মশাও কামড়াবে, কিছু করার নেই।”

তা বটে মশা। চম্বল ঝোপের ফাঁকে বসে হেলিকপ্টারের মত হাত ছুঁড়ে মশা তাড়াতে থাকে। প্রত্যুষ বলে দিয়েছে চটাস করে মারা চলবে না, তাহলে বারবার আওয়াজ হবে।

“বিদেশের এজেন্সী গুলো ফিল্ডে কত রকমের প্রোটেকশান নিয়ে যায় ভাবতে পারবি না,” পল্টন চম্বলকে বলে। “আর আমাদের দেখ। ঝোপে বসে মোগলাই মশার কামড় খাচ্ছি। একটা ওডোমস অব্দি দেয়নি।”

“আমাদের বাজেট কম।” প্রত্যুষ জানিয়ে দেয়। “দুটো হাত আছে, মশা তাড়া।”

“কিসের আওয়াজ?” মিস্টার চেঙ্গিস বলেন।

সবাই চুপ করে যায়। একটা আওয়াজ আসছে।

“মাটি কাটার আওয়াজ,” পল্টন বলে। “কেউ হয়তো গর্ত করছে।” বলে শুয়ে পড়ে লম্বা হয়ে।

পরক্ষণেই উঠে বসে ইলেকট্রিক শক খাওয়ার মতো। গর্ত কেনো করে লোকে?

কিছু পোঁতার জন্য।

প্রত্যুষ নিচু গলায় বলে, “চম্বল, আওয়াজটার দিকে একটু এগিয়ে দেখ কিছু বুঝতে পারিস কিনা।”

চম্বল উঠে দাঁড়াতে যায়। পল্টন হাত ধরে বসিয়ে দেয়। বলে, “উঁহু, দাঁড়াস না। আওয়াজ কাছ থেকে আসছে। হামাগুড়ি দিয়ে যা।”

অতএব চম্বল ঝোপের মধ্যে গিয়ে ঢোকে। অন্ধকার, মশা, কাঁটা।

এই কি টাইম ট্রাভেল?

খানিকটা কাঁটাঝোপ পেরিয়ে একটু ফাঁকা জায়গা। তারপর আরো কয়েকটা গাছ এবং তার গায়ে লতা পাতা ঝোপঝাড়। কিন্তু তার পেছনে আবার খোলা মাঠ।

একটু বাঁদিক করে সেই লতা পাতার ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। চম্বল কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থাকে। কিন্তু কোন গলার আওয়াজ শুনতে পায় না। শুধু সেই একটাই আওয়াজ। মাটি কাটার আওয়াজ।

একটু অপেক্ষা করে আস্তে আস্তে বাঁদিক এগোয় চম্বল। লতাঝোপটার সামনে এসে বুকে হেঁটে এগোতে থাকে। ব্যাপারটা বেশ কষ্টকর। এগোনোর বেগও খুব কম। চম্বল টিভিতে এবং সিনেমায় দেখেছে সেনাবাহিনীতে বুকে হাঁটা শেখায়। জওয়ানদের দেখে মনে হয় কাজটা এমন কিছু শক্ত নয়, কিন্তু এখন চম্বল হাড়ে হাড়ে বুঝছে।

বেশি জোরে হাঁপালেও মুশকিল। কারা মাটি কাটছে তারা শুনে ফেলতে পারে। আরো একটু এগিয়ে শেষ ঝোপগুলোর কাছে পৌঁছয় চম্বল। এর ওপাশেই মাঠ। হাতের ওপরে মাথা দিয়ে কিছুক্ষণ দম নিয়ে নেয়। তারপর ঝোপের ফাঁক দিয়ে অতি সন্তর্পনে উঁকি দেয়।

মাঠের মধ্যে দুটো মশাল পোঁতা রয়েছে। একটা লোক কোদালের মত কি একটা নিয়ে মাটি কোপাচ্ছে। লোকটার পরনে শুধু একটা হলুদ পাজামা। গা খালি। অন্যদিকে একটা নিচু কাঠের টুলের ওপরে ঘিয়ে রঙের চামড়া বিছিয়ে তার ওপর বসে আছে আর একজন লোক। গালে চাপ দাড়ি, মোঙ্গল মুখাবয়ব। গায়ের পোশাক সম্পূর্ণ কালো। লোকটা চামড়ার জামার ওপর একটা লোহার জালিকা পড়ে আছে, যেন এখনই তলোয়ার যুদ্ধে নামবে। মাথার শিরস্ত্রানটা খুলে হাঁটুর ওপর রাখা।

পেছনে একজন তৃতীয় ব্যক্তিকেও দেখতে পায় চম্বল, কিন্তু মুখ বুঝতে পারে না। শুধু লোকটার গাঢ় লাল কামিজটা দেখতে পায়।

খুব আস্তে আস্তে পিছিয়ে আসে চম্বল। একটাও আওয়াজ না করে। এক সময় মনে হয় যেন পিছুহাঁটার কোনো শেষ নেই। এতক্ষন লেগেছিলো এগোতে? নাকি ভুল দিকে যাচ্ছেড়? পেছনে তাকিয়ে মনে হচ্ছে পথ ঠিকই আছে। একবার উঠে বসে দেখবে? কিন্তু খুব সাবধানে করতে হবে।

ধীরে ধীরে হাতের ওপর ভর দিয়ে মাথা তোলে চম্বল। কোমরটা যেই তুলতে যাবে, অমনি পেছন থেকে,  প্রত্যুষ ফিসফিস করে বলে, “উঠিস না, নিচু থাক।” তারপর এগিয়ে চম্বলের পাশে চলে আসে।

খানিকটা বুকে হেঁটে, খানিকটা গড়িয়ে পল্টন আর মিস্টার চেঙ্গিস এসে পৌঁছন। নিচু গলায় মাঠের মাঝে দেখা দৃশ্যটা সবাইকে জানায় চম্বল।

“আমার মনে হচ্ছে আমরা একেবারে মোক্ষম সময় এসে পৌঁছেছি,” প্রত্যুষ বলে। “তলোয়ার সমাধি দেওয়া চলছে।”

প্রত্যুষ এগিয়ে যায় চম্বলের দেখানো ঝোপটার দিকে। বাকিরা পেছন পেছন।

দূর, আবার যদি যেতেই হবে তো ফেরার কি দরকার ছিলো? চম্বল মনে মনে গজরায়। মুখে কিছু বলতে সাহস হয় না। কোনো রকমে হেঁচড়ে সবার পেছনে এগোতে থাকে। ভাগ্যিস কামিজটা গোটাহাতা। নাহলে কনুই কেটেছড়ে শেষ হয়ে যেতো।

ঝোপের পেছন দিয়ে মাত্র এক ঝলক দেখেন মিস্টার চেংগিস। তারপরেই প্রত্যুষের দিকে ফিরে থাম্বস আপ দেখান।

“বাবর?” প্রত্যুষ প্রায় নিঃশব্দে প্রশ্ন করে।

মিস্টার চেঙ্গিস মাথা ঝাঁকান। “কালো জামাটা বাবর।”

কিছুক্ষণ সবাই নিঃশব্দে মাটি কোপানো দেখতে থাকে। লোকটা মাটি খুঁড়েই চলেছে, কোমর পর্যন্ত ঢুকে গেছে গর্তে। প্রত্যুষের মাথায় একটা দুশ্চিন্তা দানা বাঁধতে থাকে।

বাবরের পায়ের কাছে একটা তলোয়ার রাখা। বাবরের চোখ মাটি কোপানোর দিকে।

লোকটা থামছে না।

পল্টন প্রত্যুষের কানের কাছে মুখ নিয়ে আসে। “কত নিচে পুঁতবে তরোয়াল?”

প্রত্যুষ কাঁধ ঝাঁকায়। একটা সমস্যা হতে চলেছে, দেখতে পায় প্রত্যুষ। এক কোমর মাটি কেটে তরোয়ালটা বার করে আনা মোটেই সোজা কাজ হবে না।

বাবরের পেছনের লোকটা সামনে এগিয়ে আসে এবারে। তার গাঢ় লাল কামিজের ওপরে নীল হলুদ ফুলের নকশা। গালে বাবরের মতোই চাপ দাড়ি। বয়স বেশী না, উনিশ কুড়ি হবে।

“হুমায়ুন,” মিস্টার চেঙ্গিসের চাপা গলা শোনা যায়।

হুমায়ুন নিচু হয়ে গর্তটা দেখে। তারপর আবার অন্যদিকে সরে যায়।

লোকটা মাটি কুপিয়েই যাচ্ছে।

“প্রত্যুষদা! কি করবো?” পল্টন আবার বলে।

প্রত্যুষ বুঝতে পারে না এতটা খোঁড়ার কি দরকার। এক ফুট খুঁড়ে পুঁতে দিলেই তো হত। চার-পাঁচ ফুট নিচে পুঁতলে সেটা ওরা আবার খুঁড়ে বার করবে কি করে?

লোকটা এখন বুক অব্দি গর্তের মধ্যে। এবং এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।

গলা অব্দি।

এবার বাবর উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে এসেছেন গর্ত দেখতে। তারপর এক লাফ দিয়ে নেমে পড়েছে্ন গর্তে। কিন্তু বাবরের উচ্চতা ঐ লোকটার থেকে কম। তাই শুধু চোখ আর কপাল বেরিয়ে আছে মাটির ওপর।

“নিজেই কবর হয়ে যাবে নাকি?” চম্বল জানতে চায়।

কিন্তু প্রশ্ন নিস্প্রয়োজন। বাবর আবার নিজেই লাফিয়ে বেরিয়ে এসেছেন। মাটি কাটার লোকটাকে হাত দিয়ে ইঞ্চিখানেক পরিমান দেখিয়ে আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসেছেন।

“নিজের উচ্চতার সমান গর্ত করে সমাধি দেবে,” প্রত্যুষ ঘাড় ঘুরিয়ে বাকিদের বলে।

“এত নিচ থেকে আমরা বার করবো কিকরে?” পল্টন আবার জিজ্ঞাসা করে।

“সম্ভব না, অন্যভাবে করতে হবে। সবাই পিছোতে থাকো। অন্তত দশ ফুট।”

এ তো মহা আপদ। আবার পিছোতে হবে? চম্বল মনে মনে দাঁত কড়মড় করে। কিন্তু বাকিরা কোনো প্রতিবাদ না করেই পিছোতে শুরু করেছে। বোঝাই যাচ্ছে এদের অভ্যেস আছে।

বেশ খানিকটা পিছিয়ে প্রত্যুষ থামে। বলে, “আমরা বাবরের সাথে সরাসরি কথা বলবো। আমি একাই কথা বলবো, মিস্টার চেঙ্গিস অনুবাদ করবেন। তোরা তরোয়াল কোমরে গুঁজে রাখবি।”

“বাবরের সামনে যেতে হবে?” চম্বল চিন্তিত হয়ে পড়ে।

পল্টন উত্তর দেয়। “এত বড় গর্ত আবার খুঁড়ে তরোয়াল বার করতে পারবো না আমরা। যারা চুরি করেছিলো তারা নিশ্চয়ই দল বেঁধে কোদাল বেলচা নিয়ে এসেছিলো।”

“এসেছিলো না,” প্রত্যুষ শুধরে দেয়। “আসবে।” তারপর কানে যন্ত্র লাগিয়ে অহনাকে কল করে। বলে, “আমরা বাবরের সামনে যাচ্ছি। যদি অবস্থা বেগতিক হয় তাহলে এক মুহূর্তের মধ্যে আমাদের এই যুগ থেকে সরিয়ে নিতে হবে। তুই মেশিন স্ট্যান্ডবাই রাখতে বল। আমি কমিউনিকেশান চ্যানেল খোলা রেখে দিচ্ছি।”

কানের যন্ত্রটা কান থেকে বার করে একটা ক্লিপ দিয়ে গলার কাছে কামিজের সাথে আটকে নেয় প্রত্যুষ। আলো আঁধারির মধ্যে কেউ বুঝতে পারবে না।

“এবারে সবাই আমাকে ফলো করে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াবে। আমরা হেঁটে ওদের সামনে যাবো। ওরা যেনো বুঝতে না পারে যে আমরা লুকিয়ে ছিলাম।”

যাক, অবশেষে হেঁটে। চম্বল শান্তি পায়। প্রত্যুষের পেছনে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ায়।

পল্টন বিরবির করে কিসব বলে ওঠে। শুনে মনে হয়, “এই সেরেছে।”

কারনটা স্পষ্ট। ঝোপের ওপারে তিনজন নয়, সাতজন লোক। বাবর, হুমায়ুন আর মাটি কাটার লোকটি ছাড়াও আরো চারজন মুঘল সৈন্য। দু’জন বাবরের পেছনে আর দু’জন উল্টোদিকে। ঝোপের ফাঁক থেকে এদের দেখা যায়নি। চারজনের মধ্যে দুজনের হাতে বল্লম, দুজনের হাতে খোলা তরোয়াল আর চারজনের হাতেই ঢাল। সবার পরণে লোহার জাল, মাথায় নাক অব্দি ঢাকা শিরস্ত্রান।

বাবরের বডিগার্ড।

চারজনেরই ঘাড় ঘুরে গেছে চম্বলদের দিকে। দু’জনের হাতের বল্লম ইতিমধ্যেই আক্রমনাত্মক ভঙ্গিতে এসে গেছে।

“থামবি না। ফলো মি।” প্রত্যুষ সটান ঝোপের ফাঁক দিয়ে এগিয়ে যায়।

হুমায়ুনের হাতে তলোয়ার উঠে এসেছে। মাটি কাটার লোকটা এক লাফে ওপরে উঠে এসেছে। তার হাতের কোদালটা এখন অস্ত্রে রূপান্তরিত।

শুধু বাবর অবিচল। সামান্য ঘাড় ঘুরিয়ে ওদের দিকে তাকিয়েছেন মাত্র।

প্রত্যুষ গর্তের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। বাবরের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করে। দেখাদেখি পল্টন আর চম্বলও মাথা ঝোঁকায়। মিস্টার চেঙ্গিস প্রত্যুষের পাশে এগিয়ে এসে মুঘল ভাষায় কিছু বলেন, খুব সম্ভবত অভিবাদন।

বাবরের মুখের একটা পেশিও নড়েনি। কোনো অভিবাদন তাঁর কানে গেলো বলে মনে হয়না।

“বলুন তলোয়ারটা না পুঁততে,” প্রত্যুষ মিস্টার চেঙ্গিস কে বলে। চোখ বাবরের ওপর স্থির।

মিস্টার চেঙ্গিস এক মুহূর্ত দ্বিধা করেন। প্রত্যুষ ঘুরে তাকায়। “বলুন। ভয় পাবেন না।”

চম্বল লক্ষ করে হুমায়ুনের ভুরু কুঁচকে গেছে। কারণটা খুব সম্ভবত বাংলা। এই ভাষা এখানে কেউ শুনেছে বলে মনে হয়না।

মিস্টার চেঙ্গিস যা বলার বলেন।

বাবরের বাঁদিকের ভুরুটা কয়েক মিলিমিটার ওপরে ওঠে।

প্রত্যুষ বলে, “বলুন তরোয়াল পুঁতলে ওনার জীবন বিপন্ন হবে।”

মিস্টার চেঙ্গিস অনুবাদ করেন।

বাবরের পেছনের দুজন সৈন্য খাপ থেকে তরোয়াল বার করে।

প্রত্যুষ বলে, “কারণ ওই তরোয়ালে ওনার জান আছে, মায়া আছে, ভালোবাসা আছে।”

এইবার বাবরের চোখ ছোট হয়। বাবর আর মিস্টার চেঙ্গিসকে দেখছেন না, দেখছেন শুধু প্রত্যুষকে।

“নিজের জানকে কবর দিতে নেই।”

বাবর কি একটা বলে ওঠেন। শুনে মনে হয় একটা প্রশ্ন।

“বাবর জিজ্ঞাসা করছেন আপনি কে।”

“বলুন ওনার শুভানুধ্যায়ী। আর বলুন, যে জ্যোতিষি ওনাকে তরোয়াল কবর দিতে বলেছে, সে জানতো না বাবরের কাছে তরোয়াল কত প্রিয়।”

উত্তর শুনে বাবর একবার নিজের পায়ের সামনে রাখা তরোয়ালটির দিকে তাকিয়ে আবার কিছু প্রশ্ন করেন।

“জিজ্ঞাসা করছেন, আপনি জ্যোতিষির কথা কিকরে জানলেন।”

প্রত্যুষ শুধু হাসে। কোনো উত্তর দেয় না।

হুমায়ুনের ভুরু আরো কুঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু বাবর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন প্রত্যুষের দিকে।

আবার একটা প্রশ্ন।

“আর কি জানেন আপনি?” মিস্টার চেঙ্গিস অনুবাদ করেন।

“জানি যে, তরোয়াল সমাধি না দিলে আপনার ছেলে কাল যুদ্ধে মারা যাবে। সেটা আপনিও জানেন।”

হুমায়ুনের হাতে উদ্যত তরোয়াল উঠে এসেছে। এক ধাপ এগিয়ে এসে দাঁত চেপে প্রতুষকে কিছু বলতে যায়।

“নাসির!” বাবর চাপা গলায় ধমক দেন হুমায়ুনকে। হাতের ইশারায় পিছিয়ে যায় হুমায়ুন, কিন্তু তরোয়াল ঢোকায় না।

“তরোয়াল সমাধি দিলে আপনার ক্ষতি হবে আর না দিলে আপনার ছেলে মারা যাবে,” প্রত্যুষ বলে।

বাবরের চোখের তারায় মশালের আলো নাচছে। মুখ পাথরের মত।

যে লোক একবার কুসংস্কারে বিশ্বাস করেছে, সে আবারো কুসংস্কারে বিশ্বাস করবে।

“আমি এর সমাধান করতে পারি,” প্রত্যুষ জানায়।

যে লোক একবার ভুয়ো জ্যোতিষির কথা মেনেছে, সে আবারো মানবে।

বাবর প্রশ্ন করেছেন।

“উনি জানতে চাইছেন আপনারা কারা এবং কোথা থেকে আসছেন।”

“বলুন বঙ্গদেশ থেকে আসছি। সেখানে সবার অনেক জ্ঞ্যান।”

বাবরের মুখ দেখে বোঝা যায়না তিনি বঙ্গদেশের নাম শুনেছেন না শোনেননি। তবে তিনি জানতে চান প্রত্যুষ কি সমাধানের কথা বলছে।

“ওনাকে বলুন, যে ওনার তরোয়ালের অশুভ সত্বাটিকে আমি আরেকটা তরোয়ালে পাঠিয়ে দেবো আর ওনার তরোয়ালটা আমাদের কাছে যুদ্ধ শেষ হওয়া অব্দি রেখে দেবো, যাতে তার কোনো প্রভাব না পরে।”

শুনে বাবর ভুরু কুঁচকান। হুমায়ুন ঝুঁকে ওনার কানে কিছু বলে।

হুমায়ুনের পুরো ব্যাপারটা পছন্দ হচ্ছে বলে মনে হয় না।

বাবর গোঁফে তা দেন।

“ওনাকে বলুন যুদ্ধ কাল বিকেলেই শেষ হবে। হয় এদিক, নয় ওদিক। আর উনি যদি আমার কথা মানেন, তাহলে এদিক।”

এই কথা শুনে হুমায়ুন আবার তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে। মিস্টার চেঙ্গিস নিচু গলায় বলেন, “হুমায়ুন বলছে কোন সাহসে আমরা থ্রেট দিচ্ছি।”

কিন্তু বাবরের মাথা হুমায়ুনের থেকে ঠান্ডা। সেটা ভাগ্যের বিষয়। বাবর হুমায়ুনকে কিছু বলেন, যেটা শুনে হুমায়ুন চুপ করে যায়, কিন্তু তরোয়াল ঢোকায় না।

“বাবর বলছেন, জ্যোতিষির সাথে কথা বলার সময় শুধু তিনি আর হুমায়ুন ছাড়া কেউ ছিলো না। কেউ জানে না জ্যোতিষি এসেছিলো। সেই কথাটা আমরা যখন জানতে পেরেছি, তখন আমাদের কিছু ক্ষমতা আছেই।”

এবার হুমায়ুন প্রশ্ন করে। কাল বিকেলেই যুদ্ধ শেষ হবে সেটা প্রত্যুষ কিভাবে জানলো? কি দেখে?

“বলুন আমি ভবিষ্যৎ থেকে অতিত দেখতে পারি।”

“আর বর্তমান?” বাবর বলে ওঠেন।

প্রত্যুষ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে বাবরের দিকে। তারপর বলে, “বর্তমান এটাই, বাবর শাহ, যে হিন্দুস্থান আপনার ভালো লাগছেনা। দিল্লির সিংহাসন আপনি চান, কিন্তু দিল্লি শহর আপনি চান না। বর্তমান এটাই, যে আপনি ভাবতে শুরু করেছেন যুদ্ধে জেতার পর এই রাজ্যের ভার আপনার ছেলের হাতে দিয়ে আপনি চলে যাবেন হিন্দুস্থান ছেড়ে। আপনার মন কাঁদে কাবুলের জন্য, তাই না? হিন্দুস্থানের শাহেনশাহ আপনার ছেলেকেই করবেন, তাই তো??”

পুরো অনুবাদ শেষ হওয়ার আগেই বাবর সোজা হয়ে বসেছেন।

হুমায়ুনের মুখে বিস্ময়। সে একবার প্রত্যুষের দিকে তাকাচ্ছে, একবার তার বাবার দিকে। অবশেষে থাকতে না পেরে বাবরকে কি যেন বলতেও যায়, কিন্তু বাবর হাতের এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দেন তাঁর ছেলেকে।

“কিন্তু কাবুলে আপনি এখনি যেতে পারবেন না,” প্রত্যুষ বলে। “আপনাকে একটা সাম্রাজ্য স্থাপন করতে হবে তো।”

বাবর একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন প্রত্যুষের দিকে। প্রত্যুষও উলটে তাকিয়ে রয়েছে, মুখে হালকা হাসির রেখা।

চম্বল বুঝতে পারে না কি হত চলেছে। বাবর কি ওদের কথা মেনে নেবেন, নাকি ওদের গলা কেটে টাঙ্গিয়ে দেবেন। হুমায়ুনের হাতে ছেড়ে দিলে দ্বিতীয়টা অবশ্যম্ভাবী।

যদিও হুমায়ুন আপাতত রাগের থেকে বেশি অবাক।

বাবর চাপা গলায় কিছু বলেন। মিস্টার চেঙ্গিস বলেন, “বাবর বলছেন উনি জানেননা আপনি ওঁর মনের কথা কিকরে জেনেছেন, কিন্তু এই কথা যেন বাইরে না যায়।”

প্রত্যুষ বুকে হাত দিয়ে মাথা ঝোঁকায়।

বাবর পায়ের কাছ থেকে তরোয়ালটা তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ান। তার পর এগিয়ে আসেন প্রত্যুষের দিকে। চম্বল ভাবে তরোয়াল বার করবে, না পেছন ফিরে দৌড়বে। কিন্তু পেছনে দুটো মুঘল সৈন্য থামের মত দাঁড়িয়ে আছে।

বাবর সামনে এসে দাঁড়ান। প্রত্যুষের চোখে চোখ।

তারপর হাতের তরোয়ালটা ঘুরিয়ে হাতলটা বাড়িয়ে ধরেন প্রত্যুষের দিকে। প্রত্যুষ আর একবার মাথা ঝুঁকিয়ে তরোয়ালটা নিয়ে নেয়।

চম্বল একটা নিঃশ্বাস ছাড়ে।

বাবর মিস্টার চেঙ্গিসের দিকে তাকিয়ে কিছু বলেন।

“উনি জিজ্ঞাসা করছেন আপনি কোথায় আপনার কাজ করতে চান।”

“এখানেই।”

বাবর ফেরত গিয়ে বসে পড়েন টুলটার ওপর। হুমায়ুনের তরোয়াল এতক্ষণে আবার খাপে ঢুকেছে।

প্রত্যুষ বাবরের তরোয়ালটা নিয়ে গর্তের সামনে এগিয়ে যায়। একবার নাটকিয় ভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে সোজা তরোয়ালটা গর্তের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। তারপর নিজের তরোয়ালটা বার করে। সাথে সাথে বাবরের পেছনের সৈন্যদুজন তাদের তরোয়াল খাপ থেকে বার করে এক পা এগিয়ে আসে। কিন্তু বাবর অধৈর্‍‍য ভাবে হাতের ইশারায় দুজনকে থামিয়ে দেন।

প্রত্যুষ নিজের তরোয়ালটাও ছুঁড়ে ফেলে দেয় গর্তের মধ্যে। ঠননন...আওয়াজ আসে নিচে থেকে।

কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে প্রত্যুষ।

তারপর মন্ত্র পড়ার মত করে উদাত্ত গলায় বলে ওঠে,

“হাঁস ছিলো সজারু, ব্যকরণ মানি না।

হয়ে গেলো হাঁসজারু কেমনে তা জানি না।”

চম্বল বিষম খায়।

মিস্টার চেঙ্গিসের ভুরু কুঁচকে গেছে।

“বক কহে কচ্ছপে বাহবা কি ফুর্তি,

অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।”

মিস্টার চেঙ্গিস জানান, “এইটা চাগাতাই তুর্কিতে অনুবাদ করা খুব শক্ত।”

“প্রয়োজন নেই,” পল্টন নিরস্ত করে।

প্রত্যুষের চোখ বন্ধ, দুই হাত সামনে উঁচু করে ধরা।

“টিয়ামুখো গিরগিটি মনে বড় শঙ্কা,

পোকা ছেড়ে শেষে কি গো খাবে কাঁচালঙ্কা?

ছাগলের পেটে ছিলো না জানি কি ফন্দি,

চাপিলো বিছার ঘাড়ে, ধরে-মুড়ো-সন্ধি।”

বাবরের মুখের ওপর মশালের আলো খেলা করছে। বাবর তাকিয়ে আছেন কিন্তু মাটির দিকে। ভ্রুকুঞ্ছিত।

“জিরাফের সাধ নাই মাঠে-ঘাটে ঘুরিতে,

ফড়িঙের ঢং ধরি সেও চায় উড়িতে।”

হুমায়ুনের হাত খাপে ঢোকানো তরোয়ালের মুঠিতে। চোখ প্রত্যুষের দিকে, কিন্তু সে চোখে দৃষ্টি নেই। মন অন্য কোথাও, বোধহয় হিন্দুস্থানের সিংহাসনে।

“গরু বলে আমারেও ধরিলো কি ও রোগে,

মোর পিছে লাগে কেনো হতভাগা মোরগে?”

বাবরের পেছনের দুই পেয়াদার মুধ ভাবলেশহীন, শুধু চোখগুলো এক এক করে সবার ওপর দিয়ে ঘুরে যাচ্ছে।

প্রত্যুষ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে গর্তের মুখে। নিচে ঝুঁকে প্রায় ফিস ফিস করে বলে, “হাতিমির দশা দেখ, তিমি বলে জলে যাই, ...”। বাকিটা আর শোনা যায় না।

এতক্ষণে চম্বলের মনে হয় যে বাবর হয়তো সত্যিই মাথা কাটবেন না। হয়তো ওরা সবাই ফিরতে পারবে সেই বারুইপুরের বাড়িটায়।

বিশ্বাস হয় না। সন্ধেয় ও লোকাল ট্রেনে করে বাড়ি ফিরবে এর পরে। ট্রেনের লোকেরা কেউ ভাবতে পারবে? কেউ ভাবতে পারবে ও বাবরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো?

আর কেউ ভাবতে পারবে পৃথিবীর ইতিহাসে বাবরই প্রথম, যিনি সুকুমার রায়ের ছড়া শুনলেন?

কিন্তু ও বাবরের সামনেই দাঁড়িয়ে আছ। হুমায়ুন ওর দিকে তাকিয়ে দেখছে। সেই বাবর, সেই হুমায়ুন। সেই ইতিহাস বইয়ের মুঘল আমলের পরিচ্ছেদগুলোর থেকে উঠা আসা নামগুলো।

মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্টাতা বাবর এখন ওর সামনে বসে মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন।

“লোকটাকে বলুন বাবরের তরোয়ালটা তুলে আনতে।”

ঘোর কেটে যায় চম্বলের। প্রত্যুষ তার মন্ত্রচ্চারণ শেষ করে উঠে দাঁড়িয়েছে। মিস্টার চেঙ্গিস আবার অনুবাদ শুরু করেছেন।

বাবরের সম্মতিতে মাটি কাটা লোকটা ঝাঁপিয়ে নামে গর্তের মধ্যে। তারপর উঠে আসে হাতে বাবরের তরোয়ালটা নিয়ে। প্রত্যুষ বলে সেটাকে মাটিতে নামিয়ে রাখতে। তারপর সেটাকে সন্তর্পনে দু’হাত দিয়ে তুলে আনে, যেন পড়লেই ভেঙ্গে যাবে।

“বাবরকে বলুন যে, যে অভিশপ্ত তলোয়ারটা গর্তের নিচে পড়ে আছে, সেটাকে যেন ভালো করে কবর দেয়। আর বলুন  আমাদের একটা তাঁবু দিতে। আমরা চারজনে এখন সেই তাঁবুতে গিয়ে ঢুকবো এবং কাল বিকেলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর বেরোবো। তার মাঝে কেউ সেই তাঁবুতে ঢুকবে না। তবে সৈন্যরা ঘিরে থাকতে পারে। বলুন, আমাদের খাবার বা জল কিছুর প্রয়োজন হবে না।”

বাবর শুনে হুমায়ুনের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়েন। হুমায়ুন পেছনের একজন সৈন্যকে নির্দেশ দেয়। কিছু আলোচনা হয়। তারপর মিস্টার চেঙ্গিস জানান, “ওরা রাজি হয়েছে। এই দুজন সৈন্য আমাদের নিয়ে যাবে।”

 

তাঁবুতে ঢুকেই চম্বল বলে, “এবার কি করবো?”

প্রত্যুষ বলে, “মিনিট দশেক একটু বসি। তারপর ফিরে যাবো।”

বাবরের তরোয়ালটা সবাই হাতে নিয়ে দেখে। ফলাটা প্রায় চার ইঞ্চি চওড়া। হাতলটা মনে হয় সোনার জল করা, তার ওপর নানারকম লতাপাতার কারুকার্য।

“এটা নিয়ে চলে গেলে বাবর রেগে যাবে না?” চম্বল জিজ্ঞাসা করে।

“বাবর যখন জানতে পারবে তখন যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে এবং লোদির বাহিনী হেরে গেছে,” প্রত্যুষ বলে। “বাবর তখন দিল্লির সিংহাসন দখল করতে যাবে, না বঙ্গদেশের চার জ্ঞানী  খুজতে যাবে?”

একসময় তলোয়ারটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় প্রত্যুষ। “চলো এবার সবাই। ফেরত যাই।”

 


 বর্তমান। 

হাতে একটা স্টাইরোফোম কাপে আইস টি নিয়ে সোফায় বসে ছিলো চম্বল। পল্টন একটা স্যান্ডউইচ সবে শেষ করেছে আর প্রত্যুষ অনেকক্ষণ ধরে একটা কফি নিয়ে বসে আছে। কফির ওপরে সর পরে গেছে কিন্ত প্রত্যুষের হুঁশ নেই। লোকটা ঘুমোচ্ছে কিনা বুঝতে পারেনা চম্বল।

অহনা এসে ঘরে ঢোকে। বলে, “হিস্টোরিকাল ডিসটর্শান ইজ নিল।”

চম্বল মুখ তুলে তাকায়। অহনা বুঝিয়ে বলে, “প্রতিটা মিশনের পরে আমরা একবার দেখে নিই ইতিহাসের কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে কিনা, বা বর্তমান বদলে গেছে কিনা। এক্ষেত্রে সেরকম কিছু ঘটেনি।”

“তার মানে বাবর তরোয়াল না পেয়ে বা আমাদের খুঁজে না পেয়ে খুব একটা কিছু করেনি,” পল্টন বলে।

“দিল্লী দখল করতে চলে গেছে, বললাম যে,” প্রত্যুষ ঠান্ডা কফির কাপটা তুলে চুমুক দেয়। তারপর পাঁচন গেলার মত মুখ করে নামিয়ে রাখে। “তাহলে বলা যায় মিশন সাকসেসফুল।”

“অফ কোর্স,” অহনা বলে। “কিন্তু তুমি হঠাৎ বাবরের মনের কথা জানলে কিকরে? যে, বাবরের ভারতবর্ষ ভালো লাগছে না?”

প্রত্যুষ বলে, “ছোটোবেলায় দিল্লি বেড়াতে গিয়ে হুমায়ুনের কবর দেখতে গেছিলাম। তখন স্কুলে পড়ি। জিজ্ঞেস করছিলাম বাবরের কবর কোথায়। গাইডকাকু বলেছিলেন যে বাবরের কবর কাবুলে, কারন বাবরের ওটাই ছিলো প্রিয় শহর। দিল্লি নাকি বাবরের ভালো লাগতো না। আর ভারতবর্ষের গরম নাকি সহ্য হত না। খুব অবাক হয়েছিলাম ভারতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা আফগানিস্থানে চলে যেতে চেয়েছিলেন শুনে। মনে থেকে গেছিলো। এখন টুক করে কাজে লাগিয়ে দিলাম।”

“ওটাতেই কাজ হল,” পল্টন বলে।

“তার আগেই হয়েছিলো। যখনি আমি জ্যোতিষির গোপন কথা বলে দিয়েছিলাম, তখনই বাবর বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু হুমায়ুন মানতে চাইছিলো না। কিন্তু যখন শুনলো বাবা তাকে দিল্লির সিংহাসন ছেড়ে দিতে চায়, তখন একটু...”

“...ভাবুক হয়ে পড়লো।” পল্টন শেষ করে।

ডক্টর বৈদ্য আসেন। সবার সামনে তলোয়ারটা দেখার জন্য রাখেন। বলেন, “ভেরি গুড ওয়ার্ক। মেশিনটার ভুলে তোমরা বিপদের মুখে গিয়ে পড়েছিলে। আমি কমপ্লেন করবো আবার, কিন্তু তোমরা তো জানোই এই সমস্যাটা মিটতে চায় না। তাছাড়া দ্বিতীয় যুদ্ধের ওই দু’টো লোক কেন তাড়া করলো সেটাও বোঝা দরকার।”

“মেশিনের কথাটা একটু কড়া করে বলুন স্যার,” অহনা বলে। “তৃতীয় যুদ্ধের মধ্যে গিয়ে পড়ার পর বেশ কিছুক্ষণ কোনো কন্ট্রোল ছিলো না। বিপদ হতে পারতো। আমরা একেবারে প্রস্তুত ছিলাম না।”

“চিন্তা করিস না, অহনা। আমি কড়া করেই বলবো।”

কিন্তু অহনার মুখ দেখে মনে হয়না ডক্টর বৈদ্যর কড়া দাওয়াইয়ের ওপর ওর কোনো ভরসা আছে।

ডক্টর বৈদ্য আর অহনার দিকে মোটেই তাকাচ্ছেন না। বরং তিনি একগাল হেসে প্রত্যুষ, চম্বল আর পল্টনের দিকে তাকান। বলেন, “তোরা আগামী দু’দিন ছুটি নে। তারপর আমরা পরের মিশনের প্রস্তুতি শুরু করবো। ওই সুন্দরবনের পর্তুগীজ জলদস্যুর ব্যাপারটা। অহনা, তুই একটু ডিটেলগুলো...”

“স্যার, আমাকে ছেড়ে দিন।” চম্বল আইস টি নামিয়ে রেখে হাত জোর করে উঠে দাঁড়িয়েছে। ডক্টর বৈদ্য অবাক হয়ে ওর দিকে তাকান। চম্বল বলে, “আমি সাধারণ বাড়ির ছেলে। সিনেমায় নামার স্বপ্ন দেখি। অভিনেতা হতে চাই। আমি বাবর আকবরের হাতে মরতে চাই না, স্যার। আমার বাড়িতে বাবা মা আছেন। হুমায়ুন গলা কেটে মেরেছে, এটা কেউ বিশ্বাস করবে না। পুলিশ আমার বাবা মা কে অ্যারেস্ট করবে। এরপরে আপনি বলছেন আবার জলদস্যুদের সাথে কি করতে হবে। প্লীজ স্যার আমাকে আর দয়া করে এর মধ্যে জরাবেন না।”

“আহা, তুমি এত উতলা হয়ে পড়ছো কেন চম্বল? তুমি তো খুব ভালোভাবেই...”

“প্লীজ স্যার আমি অভিনেতা হতে চাই, আমি পর্তুগালে গিয়ে সুন্দরবনের জলদস্যুর সাথে লড়াই করতে চাই না।”

“সুন্দরবনে পর্তুগালের জলদস্যু,” ডক্টর বৈদ্য শুধরে দেন। “ঠিক আছে, তুমি এত চিন্তা কোরো না। এটা একটা চাকরি। কেউ তোমাকে বাধ্য করবে না।”

চম্বল বলে, “থ্যাঙ্ক ইউ। আমি এবারে বাড়ি যাই?”

“সেকি!” ডক্টর বৈদ্য অবাক হন। “বাবরের তরোয়ালের সাথে একটা সেলফি তুলবে না?”

“আর একটা গ্রুপ ফটো,” প্রত্যুষ উঠে দাঁড়িয়েছে। “স্যার, আপনি তুলে দিন।”

অতঃপর...ক্লিক, ক্লিক।


* সমাপ্ত *