Wednesday, July 6, 2022

৬। স্থান-কাল-পাত্র

 “সবসময় জঙ্গলের মধ্যে এনে ফেলে কেনো?” চম্বল বলে।

ঠিক গতবারের মতোই সবাই আবার একটা জঙ্গলের মধ্যে এসে উপস্থিত হয়েছে। জঙ্গলটা দেখতেও একই রকম। অবশ্য জায়গাটাও এক। শুধু এখন শীতকাল।

“ইচ্ছা করেই জঙ্গলে এনে ফেলছে,” প্রত্যুষ বলে। “খোলা প্রান্তরের মধ্যে হঠাৎ আবির্ভুত হলে বিপদের আশঙ্কা থাকে। এখন আমাদের প্রথম কাজ দিক নির্দেশ করতে পারা। তার জন্য জঙ্গলটা থেকে বেরোনো দরকার। তারাহুড়োর কোনো প্রয়োজন নেই, অনেক সময় আছে হাতে। সবাই সাবধানে চলো।”

“ডুপ্লিকেট তলোয়ার নিয়ে এলে কেনো?” চম্বল হাঁটতে হাঁটতে প্রশ্ন করে। "চুরি করার পর ওই জায়গায় অন্য তরোয়াল না রাখলে সমস্যা হবে?”

“অবশ্যই,” প্রত্যুষ বলে। “চোরেরা জানতে পেরে যাবে, যে তলোয়ার আগেই চুরি হয়ে গেছে।””

চম্বল বুঝতে পারে না। “তাতে কি ক্ষতি হবে?”

“তাতে ইতিহাস বদলে যাবে! আর ইতিহাস বদলালে বর্তমানও বদলাতে বাধ্য। অর্থাৎ তুই, আমি, আমাদের চেনা দুনিয়াটা আপাদমস্তক বদলে যেতে পারে। আমাদের অস্তিত্ব না থাকতে পারে।”

“প্রত্যুষদা, ওটা কি?” পল্টন চাপা গলায় পেছন থেকে বলে ওঠে।

সবাই থেমে যায়। সামনে জঙ্গলের মধ্যে একটা খালি জায়গা। তার মাঝে একটা ঝোপের পাশে সাদা মত কি একটা।

পল্টন এগিয়ে যায় দেখতে।

একটা কনকনে ঠান্ডা হাওয়া গাছের মগডালের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। মিস্টার চেঙ্গিজ গায়ের চামড়ার জামাটা ভালো করে জড়িয়ে নেন।

পল্টন ঝোপের পাশে নিচু হয়ে কি দেখছে। তারপর হাত তুলে ওদেরকে ডাকে। তিনজনে এগিয়ে যায়।

ঝোপের পাশে একটা লোক পড়ে আছে।

সাদা কুর্তা, সাদা ধুতি। বুক রক্তে ভেসে গেছে।

পল্টন প্রত্যুষের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে। বেঁচে নেই লোকটা।

“রক্ত শুকোয়নি এখনো,” পল্টন বলে। “একটু আগেই হয়েছে।” পল্টনের একটা হাত চলে গেছে কোমরের ঝোলানো তরোয়ালের হাতলে।

প্রত্যুষ লোকটাকে দেখছিলো। “এই লোকটা মুঘল সৈন্য নয়। ধুতি পরে রয়েছে। ওর কপালে ওটা রক্ত?”

চম্বল ঝুঁকে দেখে। “না, রক্ত না।”

“সিঁদুরের তিলক।” পল্টন বলে।

প্রত্যুষ একটু চিন্তা করে। তারপর কোমরবন্ধনির থেকে যোগাযোগ করার যন্ত্রটা কানে লাগায়।

“ফিল্ড টু কমিউনিকেশান। অহনা, কাম ইন।”

“কমিউনিকেশান টু ফিল্ড, অহনা হিয়ার,” প্রত্যুষের কানে উত্তর আসে।

“আমরা একটা বডি পেয়েছি, একজন হিন্দু সৈন্যর বডি। এই যুদ্ধে হিন্দু সৈন্য কার পক্ষে থাকতে পারে?”

“ইব্রাহিম লোদির পক্ষে,” অহনা বলে। “উনি দিল্লির সুলতান ছিলেন। অনেক হিন্দু রাজারা ওনার পক্ষ নিয়েছিলেন। কিন্তু...”

“কিন্তু যুদ্ধ কাল হওয়ার কথা,” প্রত্যুষ শেষ করে। “এখন এই লোকটি কিকরে মারা গেলো?”

অহনা একটু ভেবে বলে, “হয়তো শত্রুপক্ষের সামনে পড়ে গেছিলো। যুদ্ধের আগেও ছোটোখাটো লড়াই হতে পারে। এর জন্য মিশনে বাধা আসছে?”

“নাহ,” প্রত্যুষ বলে। “আমরা ইগনোর করে এগিয়ে যাবো।”

“গুড লাক।”

“আরেকটা ব্যাপার, অহনা,” প্রত্যুষ বলে। “ভুল পোশাক বাছা হয়েছে। আরো গরম পোশাক হলে ভালো হতো। এখনই যা ঠান্ডা, রাত্তিরে খোলা মাঠে জমে যেতে হবে।”

“ঠান্ডা?” অহনা অবাক।

“হ্যাঁ, ঠান্ডা। কনকনে হাওয়া।”

কয়েক মুহূর্ত কোনো উত্তর নেই অহনার। তারপর আবার, “ঠান্ডা লাগছে তোমাদের?”

প্রত্যুষ বিরক্ত হয়। “হ্যাঁ রে বাবা, ঠান্ডা লাগছে। শীত করছে।”

“এপ্রিল মাসের কুড়ি তারিখে বিকেলবেলায় শীত করছে?” অহনা জিজ্ঞাসা করে।

এইবার প্রত্যুষ অবাক হয়। “এপ্রিল মাস?”

“হ্যাঁ। পানিপথের প্রথম যুদ্ধ একুশে এপ্রিল। তোমরা আগের দিন বিকেলবেলায়, অর্থাৎ বিশে এপ্রিলে পৌঁছেছো।”

প্রত্যুষ নিজের নাকে আর কানে হাত দে্য়। সব ঠান্ডা হয়ে আছে। এটা এপ্রিল মাস?

ঠিক সামনের দুটো গাছের ফাঁক দিয়ে দুটো ঘোড়া বেরিয়ে এসেছে। তার ওপর বর্ম পড়া দুটো লোক। হাতে খোলা তরোয়াল।

“পরে করছি,” প্রত্যুষ কলটা কেটে দেয়।

লোকদুটোর পোশাক কালো, বর্মগুলোও কালো। শুধু শিরস্ত্রান রুপোলী। পোশাক দেখে বোঝা যায় একটু উচ্চপদস্থ সৈন্য। পোশাক অন্যরকম দেখালেও প্রত্যুষদের পোশাকের সাথে মিল আছে। এবং পড়ে থাকা লোকটির পোশাকের থেকে অনেকটাই আলাদা।

এদের মুঘল হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

“বলুন আমরা মুঘল শিবির খুঁজছি।” প্রত্যুষ মিস্টার চেঙ্গিস কে বলে।

মিস্টার চেঙ্গিস অনুবাদ করেন।

লোকগুলো অবাক হয়ে তাকায়। মুখ দেখে মনে হয়না কিছু বুঝছে বলে। মিস্টার চেঙ্গিস আবার বলেন। লোকদুটো একে অপরের দিকে চায়। তারপর একজন চেঁচিয়ে মিস্টার চেঙ্গিসকে কিছু বলে। মিস্টার চেঙ্গিস একটু অবাক হন। কিন্তু উত্তর দেন। তাতে একটা লোক উলটে কিছু জিজ্ঞাসা করে যাতে মিস্টার চেঙ্গিস দৃশ্যতই অবাক হয়ে যান।

“কি বলছে ওরা?” প্রত্যুষ জিজ্ঞাসা করে।

“আমি বললাম আমরা মুঘল শিবির খুঁজছি। ওরা জানতে চাইছে কিরকম মুঘল বাহিনী।”

“বলুন বাবরের।”

মিস্টার চেঙ্গিস বলেন। লোকদুটো অট্টহাস্য করে ওঠে। তারপর একজন তরোয়ালটা খাপে ঢুকিয়ে কিছু একটা বলে হাসতে হাসতে ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। বাকি লোকটাও আর দাঁড়ায়না। এক পলকে দুজন আবার জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে যায়।

চম্বল হাঁপ ছাড়ে।

মিস্টার চেঙ্গিস বলেন, “লোকটা ভেবেছে আমরা ইয়ার্কি মারছি। বললো আজ খুশির দিন বলে ছেড়ে দিলো।”

“খুশির দিন?” প্রত্যুষ বুঝতে পারে না। “কাল এরা যুদ্ধ করবে আর আজ খুশির দিন?”

কিছু একটা গন্ডগোল হচ্ছে নাকি?

মিস্টার চেঙ্গিস আরো বলেন, “আমি প্রথমে চাগাতাই তুর্কি বলেছিলাম। এরা সেটা বুঝতেই পারলো না। তার বদলে এরা চোস্ত ফার্সি বললো। বাবরের বাহিনীতে এরকম ফার্সি কখনো শুনিনি।”

প্রত্যুষ আবার কল করে। “অহনা, সামথিং ইজ রং। মুঘল সৈন্য বাবরের আমলের ভাষা বুঝতে পারছে না। উলটে জিজ্ঞাসা করছে কোন মুঘল বাহিনী।”

পাশ থেকে একটা ধাতব শব্দ আসে। খাপ থেকে তরোয়াল বার করার আওয়াজ। প্রত্যুষ ঘুরে তাকায়। চম্বলের হাতে তরোয়াল উঠে এসেছে।

এইবার প্রত্যুষও দেখে। তিনটে লোক বেরিয়ে এসেছে। দুজনের পোশাক সাদা, একজনের ঘিয়ে রঙের। কিন্তু এরা মুঘল নয়। এরা এই নিহত লোকটির পক্ষ।

দুজনের হাতে উদ্যত তরোয়াল। চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরোচ্ছে।

রাগের কারণ বুঝতে অসুবিধা হয়না কারোরই। ওরা চারজন এখনো সেই লোকটির বডির সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। পল্টনের হাতে তরোয়াল। দেখে মনে হবে ওরাই লোকটিকে মেরেছে।

নবাগত লোকগুলির মধ্যের জন তরোয়াল ওঠায়। তারপর তিনজন সমস্বরে হুংকার দেয়, “হর হর মহাদেও!”

প্রত্যুষের কানের মধ্যে অহনার গলা ভেসে আসে, “হর হর মহাদেও বললো কেউ? প্লীজ কনফার্ম।”

জবাব দেয়না প্রত্যুষ। আর সময় নেই। খাপ থেকে তরোয়াল বার করে মিস্টার চেঙ্গিস কে গার্ড করে দাঁড়ায়।

মধ্যিখানের লোকটা চম্বলকে বেছে নিয়েছে। পল্টন উলটে এগোচ্ছে পাশের লোকটার দিকে। কিন্তু তৃতীয় লোকটা এখনো তরোয়াল বার করেনি।

চম্বল রক্ষণাত্মক চাল নিয়েছে। এক পা করে পিছোচ্ছে আর লোকটার আক্রমন ঠেকাচ্ছে। এরা কিভাবে যুদ্ধ করে জানা নেই। আগে বোঝা দরকার।

লোকটার পাগড়ির মধ্যে একটা তীর গোঁজা। আক্রমনের চিহ্ন নয়, স্বেচ্ছায় লাগানো। তীরের একদিকে লাল পালক লাগানো।

পাশে পল্টনের সাথে অন্য লোকটার জোর যুদ্ধ লেগে গেছে। দুজনেই সমান তালে আক্রমন করছে।

চম্বলের পুরো ব্যাপারটা অবাস্তব লাগতে থাকে। ও পাঁচশ বছর আগের কোনো সৈন্যর সাথে লড়ছে? কোন সৈন্য সেটাও জানেনা।

আর অবাস্তব লাগে ভাবতে যে এই লোকটা ওর সাথে জীবন-মৃত্যুর লড়াই করছে।

শেষ কথাটা মনে আসতেই হাতটা কেঁপে যায় চম্বলের। লোকটার আক্রমন ঠেকাতে গিয়ে হাতের তরোয়াল প্রায় মাটিতে নেমে আসে।

না, এসব ভাবলে চলবে না। এটা শুধু একটা লড়াই। ব্যাস।

চোখের কোনা দিয়ে তৃতীয় লোকটাকে দেখে চম্বল। সে এখনো দাঁড়িয়ে আছে।

প্রত্যুষ উত্তেজিত হয়ে অহনার সাথে কিসব বলে চলেছে।

চম্বলের প্রতিপক্ষ যেন ক্লান্ত। হুংকারে যত জোর ছিল, আক্রমনে তত নেই। আক্রমনে যাবে কিনা ভাবে চম্বল, কিন্তু শেষে ধৈর্য ধরে রক্ষণ চালিয়ে যায়। লোকটা খুব বেশিক্ষণ পারবে বলে মনে হয় না। ইতিমধ্যেই যেন তরোয়ালের বেগ কমছে। প্রতি দু’টো আক্রমনের মধ্যে সময় ও বাড়ছে।

চম্বল মাটির মধ্যে গোড়ালি চেপে দাঁড়ায়। সময় এসেছে প্রতিআক্রমনের।

কে যেন শিষ দিয়ে ওঠে।

হঠাৎ কি যেন উড়ে যায় হাওয়ায়। তারপরেই ধপ করে আওয়াজ এবং পল্টনের প্রতিপক্ষ সটাং মাটিতে।

চম্বল থেমে যায়। ওর লোকটাও দাঁড়িয়ে পড়েছে। তার দৃষ্টি চম্বলের অন্যপাশে। কপালে চিন্তার ভাঁজ।

হওয়ারই কথা। মিস্টার চেঙ্গিস বেরিয়ে এসেছেন প্রত্যুষের আড়াল থেকে। তাঁর এক হাতে একটা পাথর।

“আপনার তো দারুন টিপ,” পল্টন বলে ওঠে।

আরেকটা পাথর পড়ে রয়েছে পল্টনের প্রতিপক্ষের পাশেই। মিস্টার চেঙ্গিস সেটা লোকটার মাথায় ছুঁড়ে লোকটাকে অজ্ঞান করে দিয়েছেন।

মিস্টার চেঙ্গিস লজ্জা পেয়ে হাসেন। “দরকার পরে কখনো কখনো।”

চম্বলের প্রতিপক্ষ অবাক হয়ে দুজনের মুখের দিকে তাকায়। তারপর এক পা পিছিয়ে যায়। কারণ প্রত্যুষ চম্বলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

আবার শিষের শব্দ।  এবং পরক্ষণেই আরেকবার। কিন্তু এবার অন্যদিক থেকে।

“আরো লোক আসছে, প্রত্যুষদা!” পল্টন বলে ওঠে।

সেই দাঁড়িয়ে থাকা তৃতীয় লোকটা যুদ্ধ না করে শিষ দিয়ে দিয়ে ওদের সঙ্গীসাথীদের ডেকে এনেছে।

চম্বলের প্রতিপক্ষের মুখে এবার হাসি ফুটে উঠেছে। সে তলোয়ারটা সামনে তুলে চম্বল কে ঈশারা করে এগিয়ে আসতে।

ঠন-ঠক!

তরোয়াল মাটিতে। লোকটা হাত চেপে বসে পড়েছে। পাশে একটা পাথর পড়ে রয়েছে। মিস্টার চেঙ্গিসের নিশানা অব্যার্থ।

“চমৎকার!” প্রত্যুষ বলে ওঠে। “কিন্তু আর না। এবার পালাতে হবে। পল্টন, চম্বল...ফলো মি!”

একদিকে গাছের ফাঁক দিয়ে বেশ কিছু লোক বেরিয়ে এসেছে। দেখেই বোঝা যায় এরা একই দলের লোক। কিন্তু এদের অনেকেরই জামাকাপড় ছেঁড়া, কাদা লাগা। কারুর কারুর গায়ে রক্ত লেগে রয়েছে।

যুদ্ধের আগের দিনেই এত আহত? চম্বল বুঝতে পারে না কি হচ্ছে। এরা কারা? কাদের সাথে লড়ছে?

পাগড়িতে তীর গোঁজা লোকটা উঠে দাঁড়িয়েছে। হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে। মুখে যন্ত্রনার ছাপ।

“চম্বল!” প্রত্যুষ চেঁচিয়ে ওঠে। ওরা সবাই ইতিমধ্যেই দৌড়তে শুরু করেছে পেছনের জঙ্গলের দিকে। “কুইক!”

“চাম-বো-ওল!” লোকটা চম্বলকে ভেঙ্গায়।

চম্বলের ইচ্ছা করে লোকটার নাকের ওপর একটা রদ্দা বসাতে, কিন্তু তাহলে ওর সঙ্গীরা ধরে ফেলবে। লোকগুলো দৌড়তে শুরু করে দিয়েছে।

চম্বল ফিরে দৌড় লাগায়।

এবার লোকটা ওর পেছনে তাড়া করেছে।

গাছের প্রান্তে প্রত্যুষ অপেক্ষা করছিলো চম্বলের জন্য। পল্টন আর মিস্টার চেঙ্গিস ঢুকে গেছেন জঙ্গলে। চম্বল সামনে পৌঁছতেই প্রত্যুষ জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে যায়।

“চামবো-ওল!” লোকটা পেছন থেকে ডাকছে।

চম্বল গাছের ফাঁক দিয়ে দৌড়তে থাকে। প্রত্যুষকে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ওর গলা শুনতে পাচ্ছে।

“স্টেটাস রেড। আই রিপীট, স্টেটাস রেড। অহনা, টেক আস আউট। ইমিডিয়েটলি এক্সট্র্যাক্ট কর আমাদের।”

প্রত্যুষের গলা অনুসরণ করে দৌড়চ্ছে চম্বল। বাকিরা কোথায় কে জানে!

“আমি জানি না এটা কোথায়, এরা কারা!” প্রত্যুষ চেঁচিয়ে বলে। “উই আর আন্ডার অ্যাটাক।”

হঠাৎ চম্বলের বাঁদিক থেকে একটা লোক এসে পড়ে। এটা অন্য একজন। মোটা উলের কালো কামিজ গায়ে, পায়ে হাঁটু অব্দি সাদা কাপড় বাঁধা। হাতে একটা ছোট ছুরি, আর কিছু নেই।

কিছু ভাবে না চম্বল। মুহূর্তের মধ্যে নিচু হয়ে মাটি থেকে একটা মোটা গাছের ডাল তুলে লোকটার মাথায় বসিয়ে দেয়। তারপর দৌড় লাগায়।

ওদিকে প্রত্যুষের গলা পাওয়া যাচ্ছে না আর।

“প্রত্যুষদা!” চম্বল চেঁচিয়ে ডাকে।

“চম্বল! আমি এদিকে!” সামনে ডানদিক থেকে গলা ভেসে আসে।

এবং পেছন থেকে, “চামবো-ওল!”

এই লোকটা তো ছাড়বে না!

“প্রত্যুষদা, আমাদের বাঁদিকে অনেক লোক।” পল্টনের গলা শোনা যায় খুব কাছ থেকেই। “ওদিকে যেও না!”

“এক্সট্র্যাকশান শুরু করছে!” প্রত্যুষ বলে। “তোরা কোনো একটা জায়গা খুঁজে লুকো।”

চম্বলের সামনেই একটা ঝোপ। চম্বল তার মধ্যে ঝাঁপ দেয়, কিন্তু সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যায়। ঝোপটা একটা ঢালু পাড়ের প্রান্তে ছিলো, চম্বল বুঝতে পারেনি। ব্যালান্স রাখতে না পেরে গড়িয়ে গিয়ে ঢালটার নিচে গিয়ে পড়ে। খুব বেশি কিছু গভীর নয়, লাগেওনি।

কিন্তু ঢালের নিচে একটা লোক। আপাতত সেই লোকটা চোখ বড় করে চম্বলকে দেখছে।

লোকটার পরণে চামড়ার বর্ম, চাপা পাজামা এবং মাথায় শিরস্ত্রান। ফর্সা মুখে দাড়ি গোঁফ নেই। হাতে কোনো অস্ত্রও নেই।

“তুমি বাবরের লোক?” চম্বল হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞাসা করে।

লোকটা হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ ওর হাত পাকড়ে ধরে নিজের ভাষায় কিসব বলতে থাকে।

“আমি জানি না! আমি নিজেই কিছু বুঝতে পারছি না।” চম্বল জোর করে ওর হাত ছাড়ায়। “চললাম, বাই।”

এক লাফে ওপরের ঝোপটা চেপে ধরে নিজেকে উঠিয়ে নেয় চম্বল। লোকটা নিচে আরো কিসব বলে চলেছে। কিন্তু চম্বলের সময় নেই।

আশপাশে গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বাংলা না।

“প্রত্যুষদা!” চম্বল ডাকে।

সামনের দুটো গাছের ফাঁক থেকে লোকটা বেরিয়ে আসে। পাগড়ির তিরটা এখন ওর হাতে। তিরের ফলাটা আসলে একটা ছুরির মত, চম্বল লক্ষ করে।

“চামবোল,” লোকটা দাঁত বার করে হাসে। তারপর থুথু ফেলে মাটিতে।

এরপরে আর কোনো সুস্থ সবল সিনেমার হিরো হতে চাওয়া বাঙালি ছেলের পক্ষে ঠান্ডা থাকা সম্ভব না। চম্বল হুঙ্কার দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

লোকটা তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলো না। বোধহয় ভাবতে পারেনি চম্বল এভাবে আক্রমন করতে পারে। দুই সেকেন্ডের মধ্যেই লোকটাকে মাটিতে ফেলে তার ওপর চেপে বসে চম্বল। লোকটার ডান হাতটা চেপে রাখে ওর তলোয়ারের চওড়া দিকটা দিয়ে। অন্য হাত দিয়ে তিরটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।

বলে, “বল, চম্বল।”

হুড়মুর করে লতাপাতা ছিঁড়ে পল্টন এসে উপস্থিত হয়। “চল চল লুকোতে হবে! নাহলে মেশিন রিটার্ন করাবে না।”

চম্বল মাথা তুলে তাকায় পল্টনের দিকে। সব কথা কানে ঢোকেনি।

পল্টন চম্বলের কাঁধ খামচে ধরে। “ওকে ছাড়।”

চম্বল শেষবারের মত লোকটার দিকে ফেরে, “শুনে রাখ। নামটা চম্বল। তার একটা কারণ আছে।”

পল্টন চম্বলকে টেনে উঠিয়ে নেয়। তারপর খানিকটা টেনে খানিকটা হেঁচড়ে একটা গাছের পেছন নিয়ে যায়।

চম্বল দেখে লোকটা উঠে বসে ঘাসের মধ্যে ওর তিরটা খুঁজছে।

পাশ থেকে কে যেন বলে, “অল মেম্বারস সিকিওর। ইনিশিয়েট নাউ।”

অন্ধকার।

ঘুরঘুট্টি অন্ধকার।

বোঁ-বোঁ শব্দ।

ধরাম করে কে যেন ঘুষি মারে চম্বলের মুখে।

সারা গায়ে ভিজে ভিজে।

এখনো অন্ধকার।

চোখ খুলেই আছে চম্বল, কিন্তু কিছু দেখতে পাচ্ছে না। কে মারলো মুখে?

ওগুলো কি? বিন্দু বিন্দু আলো। কত দূরে।

“সময় সন্ধে বা রাত্তির।” কার যেন গলা। “গরমকাল। পৌঁছে গেছি।”


Last chapter