কামিজ পাজামা ছেড়ে নিজের জামা কাপড় পরে টি উইং এর বাইরের ঘরটায় অপেক্ষা করছিলো চম্বল। বাকিরা কোথায় চলে গেছে। একটু পরে প্রত্যুষ এসে বলে, “স্যারকে ব্রিফিং করে দিয়েছি। আজ তোর আর কিছু করার নেই। কালকে আমরা বাবরের আমলে গিয়ে তলোয়ারটা উদ্ধার করে আনবো।”
চম্বল উঠে দাঁড়ায়। প্রত্যুষ বলে ওকে সামনের
অটো স্ট্যান্ডটা দেখিয়ে দেবে, যাতে ও পরের দিন থেকে নিজেই যাওয়া আসা করতে পারে।
চম্বল পা বাড়ায়। প্রত্যুষ হেসে ওর পিঠে হাত
রেখে বলে, “চুপচাপ হয়ে গেছিস দেখছি। প্রথমটা ওরকম লাগে। আস্তে আস্তে অভ্যেস হয়ে যাবে।
বিশ্বাস হতে সময় নেবে একটু।”
চম্বল মাথার মধ্যে হাত চালায়। কিছু বলে না।
কি বলা উচিৎ বুঝতে পারে না। একটু আগে মুঘল সৈন্যর মাঝে ঘোড়া ছুটোচ্ছিলো আর এখন যাচ্ছে
অটো ধরতে।
প্রত্যুষ ওকে নিয়ে বেরোয় বাড়িটা থেকে। দারোয়ান
দরজা বন্ধ করে দেয়। রাস্তায় চলতে চলতে প্রত্যুষ বলে, “আমারও প্রথম বারে এরকম অবস্থা
হয়েছিলো। আমাকে পাঠিয়েছিলো স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়। ব্রিটিশ পুলিস লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে
আছে আর দলে দলে লোক হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে তাদের সামনে মাথা পেতে দিচ্ছে। পুলিস লাঠি চালাচ্ছে
পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে আর একের পর একজন করে লুটিয়ে পড়ছে রাস্তার ওপরে। কি দৃশ্য! ঘুমোতে
পারিনি সারারাত।”
অটোস্ট্যান্ডে এসে চম্বল বলে, “লোকদুটো যদি
আমাদের ধরে ফেলতো তাহলে কি করতে?”
প্রত্যুষ বলে, “লড়াই হতে পারতো একটা। সেইজন্যই
তো তোর মত লাঠি ঘোড়া তলোয়ার জানা ছেলেকে রিক্রুট করা হয়েছে।”
চম্বল হেসে ওঠে। প্রত্যুষ একটু গলা নামিয়ে
বলে, “কাজের কথা শোন চম্বল। তুই ঠিক কি করিস সেটা কাউকে বলতে পারবি না কিন্তু। সই করে
মুচলেকা দিয়েছিস, মনে রাখিস। কিছু একটা বানিয়ে বানিয়ে বলবি। আমি বলি যে আমি ভারত সরকারের
একটা বিশেষ দফতরে ট্রেনার হিসাবে কাজ করি, যেটা গোপন কাজ এবং কাউকে বলার নিয়ম নেই।
ঠিক আছে? এবারে আয়। সি ইউ টুমরো।”
অটো, ট্রেন, বাস পেরিয়ে বাড়ি ফিরে বহুক্ষণ
ভোম্বল হয়ে বসে থাকে চম্বল। ঘোর কাটে মা’র ফোনে। চম্বল যন্ত্রের মত জানায় যে কাজটা
খুব গোপন। ক্লাসিফায়েড।
“গোপন কাজ? কিরকম গোপন কাজ যে মাকেও বলা যায়না?”
চম্বলের মা খুব উদ্বিগ্ন। “ওরা কী করাবে তোকে দিয়ে?”
“কোনো খারাপ কাজ কিছু নয়, মা। তুমি এত চিন্তা
কোরো না।”
“কিন্তু কাজটা কি সেটা তো অন্তত বলবি!”
চম্বল দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। “ঠিক সেইটাই তো বলা
বারন, মা। তুমি এত টেনশান কোরো না, প্লিজ।”
এই ঘটনাটা আরো প্রায় দশ মিনিট চলে। তারপর ফোন
নামায় চম্বল। এখন বাড়িতে ও একাই আছে, টিমো কোথাও বেরিয়েছে, এখনো ফেরেনি। রাত খুব একটা
হয়নি। খিদে পাওয়ায় জলদি খেয়ে নিয়েছে চম্বল। শেষে ল্যাপটপটা অন করে বসে। গুগুল খুলে
পানিপথের যুদ্ধের বিষয়ে দেখে। কবেকার পড়া জিনিস সব। সেই ক্লাস নাইন....
দশ মিনিটের মধ্যেই খোলা ল্যাপটপের সামনে নাক
ডাকার শব্দ পাওয়া যায়।
টিমোর সাথে দেখা হয় সকালবেলায়। সে অনেক রাতে
কখন ফিরেছে। চম্বলের মুখে গোপন চাকরির গল্প শুনে হা-হা করে হাসে টিমো। বলে, “কাল সকালে
বললি ডাকাত, আর এখন বলছিস ক্লাসিফায়েড গভার্মেন্ট জব? আমাকে কি ছাগল ঠাউরেছিস?”
চম্বল আরেকপ্রস্থ চেষ্টা করে মিথ্যা বলার কিন্তু
টিমো চম্বলের মা নয়।
“সরকারি চাকরির ইন্টারভিউ ওরকম হয় না, বন্ধু।
বলবি না, বলিস না। কিন্তু ঢপ মারছিস কেন?” টিমো আহত গলায় বলে।
চম্বল মাথা নিচু করে বসে থাকে। হাতে কাপের
চা ঠান্ডা হচ্ছে কিন্তু চুমুক দিচ্ছে না। শেষে বলে, “পরে একদিন বলবো।”
টিমো একদৃষ্টে দেখে চম্বলকে। বলে, “কিছু তো
একটা ব্যাপার আছে। সাবধানে থাকিস। উল্টোপাল্টা কিছু করে বসিস না। সিনেমার রোলের চেষ্টা
কি ছেড়ে দিলি তাহলে?”
“না, না।” চম্বল মাথা তুলে জোর গলায় প্রতিবাদ
করে। “চেষ্টা চালিয়ে যাবো। আর কিছু পেলে এই চাকরিটাই বরং ছেড়ে দেবো।”
টিমো কাঁধ ঝাঁকায়। বলে, “গুড লাক, বন্ধু। আর
কনগ্র্যাচুলেশান্স।”
বারুইপুরের বাড়িটায় পৌঁছে বাইরের বেলটা বাজাতে
সেই দারোয়ান দরজা খুলে দেয়। চম্বল ভেতরে ঢোকে। প্রত্যুষ বলেছিলো সোজা নিচে চলে যেতে।
তাই রান্নাঘরের দিকে এগোয় চম্বল। করিডর থেকে ডক্টর বৈদ্যর গলা শোনা যায়। কার সাথে যেন
ইংরাজিতে ফোনে কথা বলছেন বলে মনে হয়। “দু’জন লোক ছিল। আমার এজেন্টদের ফলো করেছিলো ঘোড়ায়।
সাথে অস্ত্রও ছিলো... হ্যাঁ...না, সেকেন্ড ব্যাটল অফ পানিপথ। ... কিন্তু কিকরে?
...”
দাঁড়ায় না চম্বল। কি দরকার শুধু শুধু আড়ি পেতে?
রান্নাঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দেয় ও। সুইচটা কালকেই দেখে রেখেছিলো। সেটা টিপতেই রান্নাঘরটা
আবার লিফটের মত নিচে নেমে আসে।
করিডরে বেরিয়ে মিটিং রুমটায় গিয়ে দেখে অহনা
একা বসে আছে। সামনে কাগজপত্র আর একটা ট্যাবলেট। মিটিং রুম থেকে বেরিয়ে বড় ডবল দরজাটা
খুলে সোফাওয়ালা কমন রুমটায় ঢোকে চম্বল। সেখানে প্রত্যুষ একটা কফি মেশিন থেকে কফি নিচ্ছিলো।
চম্বলকে দেখে হাসে। জিজ্ঞাসা করে, বাড়িতে লুকোতে পেরেছে কিনা।
“হ্যাঁ, কিন্ত কেউ বিশ্বাস করছে না।”
“আমার এখনো করে না,” প্রত্যুষ মাথা নেড়ে বলে।
ডক্টর বৈদ্যর একটু আগে টেলিফোনে বলা কথাগুলো
প্রত্যুষকে বলে চম্বল।
প্রত্যুষ শুনে বলে, “স্যারের একটু চিন্তা করার
স্বভাব আছে।”
“কিন্তু এক্ষেত্রে চিন্তার কি আছে? ওই দুটো
লোক পাঁচশ বছর আগের মুঘল সৈন্য। আমরাও আর ওই যুদ্ধে ফিরছি না। তাহলে?”
প্রত্যুষ কাঁধ ঝাঁকায়। চম্বল একটু অপেক্ষা
করে, কিন্তু প্রত্যুষ আর কিছু বলে না।
একটু পরে মিস্টার চেঙ্গিস ঘরে ঢোকেন। প্রত্যুষ
ওনাকে বলে রেডি হয়ে নিতে। পল্টন পোশাক তৈরি রেখেছে।
চম্বল মিস্টার চেঙ্গিসকে জিজ্ঞাসা করে, “আচ্ছা,
আপনি মুঘল ভাষা কোথায় শিখেছেন?”
“কাবুল, দিল্লি আর লক্ষনৌতে।”
“কাবুলে?” চম্বল চমৎকৃত হয়।
“হ্যাঁ, বাবরের আমলে কাবুলে, আকবরের আমলে দিল্লিতে
আর শাহজাহানের আমলে লক্ষনৌতে।”
চম্বল হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।
আজকের পোশাকগুলো অন্যরকম। গোলাপী বা নীল কামিজের
নিচে চাপা পাজামা। কামিজের ওপরে গাঢ় বাদামী বা মেটে হলুদ রঙের চামড়ার জামা, তার ওপরে
আবার নকশা করা। মোটা কোমড়বন্ধে ছোড়া ও তলোয়ার গোঁজার ব্যাবস্থা। পায়ের চামড়ার জুতোজোড়া
গোড়ালির ওপরে চামড়ার সরু ফালি দিয়ে বেধে নিতে হবে। সব শেষে মাথার ওপর সোনালী রঙ করা
ছুঁচলো শিরস্ত্রান।
সৈন্যের সাজ।
“যুদ্ধ করতে হবে?” চম্বল প্রত্যুষকে জিজ্ঞাসা
করে।
“না। কিন্তু সেনাবাহিনীর সাথে মিশে থাকতে হতে
পারে।”
চম্বল আয়নায় নিজেকে দেখে। বেশ একটা শাহজাহান-ঔরংজেব
জাতীয় লাগছে বটে। পল্টন আবার সেই বেগুনী স্টিকারটা লাগিয়ে দেয়।
প্রত্যুষ সবাইকে জড়ো করে বসার ঘরে। বলে, “মিশন
কি, সবার জানা আছে। আমরা বাবরের তলোয়ার উদ্ধার করতে যাচ্ছি। তলোয়ার পোঁতা এবং চুরি
হওয়ার মধ্যে সেই কাজটা সম্পন্ন করতে হবে। সেই ঘটনাটা খুব সম্ভবত মাঝরাতের আগে হবে না।
কিন্তু আমরা দিনের আলো থাকতে পৌঁছবো। বিকেল নাগাদ। যাতে জায়গাটা ঠিক করে আইডেনটিফাই
করতে পারি।”
“কিভাবে উদ্ধার করবো তরোয়ালটা?” পল্টন জানতে
চায়।
“চোরেদের আগে আমরাই চুরি করে নেবো। তুই আর
চম্বল সাথে করে মাটি কোপানোর বেলচা নিয়ে যাবি। ফোল্ডেবল আর হালকা। তোদের জামার মধ্যে
লাগিয়ে নেওয়া যাবে। সেই বেলচা দিয়ে মাটি খুঁড়ে আমরা বাবরের তলোয়ার বার করে নিয়ে আসবো
আর তারপর ওই জায়গায় এই ডুপ্লিকেটটা বসিয়ে দেবো।” প্রত্যুষ নিজের কোমরবন্ধনীর থেকে একটা
তলোয়ার বার করে দেখায়। “সুতরাং এটা আগের বারের মতো শর্ট মিশন নয়। আট-দশ ঘন্টা থাকতে
হতে পারে।”
টি-উইং এর কন্ট্রোল রুমে ঢুকে অহনা সবাইকে
গুড লাক উইশ করে। বলে, “আমি সবসময় যোগাযোগ রাখবো। মনে রাখবে, যুদ্ধটা বাবর আর ইব্রাহিম
লোদির মধ্যে। একদিকে কাবুল থেকে এগিয়ে আসা মুঘল বাহিনী, অন্যদিকে দিল্লির সুলতান লোদির
সৈন্য। লোদির বাহিনীর সাথে আমাদের কোনো দরকার নেই, বাবরের তলোয়ারই আমাদের একমাত্র টারগেট।”
আবার সেই কালো কাচের পেছনের ঘরে গিয়ে দাঁড়ায়
সবাই।
“টাইম ক্যালিব্রেশান - ফর্টি পার্সেন্ট।”
“পল্টন, কোনো ঝামেলার মধ্যে ঢুকবি না,” প্রত্যুষ
সাবধান করে। “ছ-সাত ঘন্টা সৈন্যবাহিনীর মধ্যে মিশে থাকতে হবে। গন্ডগোল বাধালে আমি মিশন
অ্যাবর্ট করতে বাধ্য হবো।”
“নো ওয়ারি, বস।”
“সিস্টেম রেডি ফর ভয়েজ। ওয়েটিং ফর সিগনাল ফ্রম
টীম লিডার,” স্পিকার জানায়।