পানিপথ, চৌঠা নভেম্বর, পনেরোশ ছাপ্পান্ন। পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধের আগের দিন সকাল।
“এসে গেছি।” প্রত্যুষের গলা পাওয়া যায় পাশ
থেকে। “সবাই ঠিক আছো?”
চম্বল ঘাড় নাড়ে। হ্যাঁ, ও ঠিক আছে।
হাতে দু’ঘন্টা সময় থাকবে, অহনা বলেছিলো। দু’ঘন্টার
পরে নিজে থেকেই বর্তমান যুগে ফিরে আসতে হবে। তবে টিম লিডার চাইলে তার আগেই সবাইকে ফেরত
আনানোর ব্যাবস্থা করতে পারে।
প্রত্যুষ পকেট থেকে একটা কম্পাস জাতীয় যন্ত্র
বার করে দেখে। একদিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলে, “ঐদিকটা উত্তর-পূর্ব। পল্টন, তুই ওই লম্বা
গাছটায় ওঠ। ওপর থেকে দেখ কিছু দেখা যায় কিনা।”
“ছোড়াটা ধরো,” পল্টন চম্বলের হাতে ওর ছোড়াটা
দেয়। তারপর তরতর করে বড় গাছটায় চড়তে থাকে। চম্বল আর প্রত্যুষ ঘাড় উঁচু করে দেখে। মিস্টার
চেঙ্গিস একটা পাথরের ওপর বসেন। শিঘ্রই পল্টন পাতার আড়ালে ঢেকে যায়।
প্রত্যুষ একটা ছোট যন্ত্র বার করে কানে লাগায়।
বলে, “অহনা, টিম অন ফিল্ড।” কয়েক মুহূর্ত শুনে ‘অল ওকে’ জানিয়ে যন্ত্রটা আবার রেখে
দেয় পকেটে।
পল্টন গাছ থেকে নেমে আসে একটু পরেই। মুখচোখে
উত্তেজনা। বলে, “যুদ্ধক্ষেত্রটা অন্যদিকে। কিন্তু সামনেই একটা সেনা ছাউনি আছে। আর তার
ওপারে একটা বাহিনী কোথাও যাচ্ছে, প্রত্যুষদা। অনেক সৈন্য। অভিমুখ মনে হল উত্তর-পূর্ব।”
“ঐটাই আকবরের সুরক্ষা বাহিনী,” প্রত্যুষ বলে।
“আমি বলেছিলাম আরেকটু আগে পাঠাতে। কিন্তু সেই লেট করেছে। এখন আমাদের ছুটতে হবে, নাহলে
ওদের ধরতে পারবো না। ওরা কত দূরে, পল্টন?”
“বেশ খানিকটা এগিয়ে আছে, মাঠটার অন্য প্রান্তে।”
“এই সেনা ছাউনিটা এড়িয়ে যাওয়া যায়না?”
“ছাউনিটা লম্বায় বেশি, চওড়ায় কম। ঘুরে যেতে
হলে অনেকটা সময় লাগবে। কিন্তু যদি সোজা ওর মধ্যে দিয়ে পেরিয়ে যাই, তাহলে তারাতারি হবে।”
প্রত্যুষের কপালে ভাঁজ পরে। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে
বলে, “ঠিক আছে, তাছাড়া উপায় নেই। আমরা ডায়মন্ড ফর্মেশানে যাবো। সামনে আমি, আমার পেছনে
মিস্টার চেঙ্গিস আর চম্বল। শেষে পল্টন। কথা শুধু মিস্টার চেঙ্গিস বলবেন। চম্বল বোবা
সাজবে আর পল্টন আসছে দক্ষিণ ভারত থেকে, তাই মুঘল বা আঞ্চলিক ভাষা কোনোটাই জানে না।
চলো।”
জঙ্গলটা খুব ঘন নয়। একটু এগিয়ে আরো পাতলা হয়ে
আসে। দূর থেকে অনেক রকম শব্দ শুনতে পায় চম্বল। ছাউনিটা কাছেই বোধহয়।
একসময় হঠাৎ শেষ হয়ে যায় জঙ্গলটা। সামনেই সারি
সারি তাঁবু। দেখে মনে হয় এটা পেছনের দিক। প্রত্যুষ এগিয়ে চলে। তার পিছনে চম্বল আর চম্বলের
ডানদিকে মিস্টার চেঙ্গিস।
দুটো তাঁবুর মধ্যে একটু ফাঁক দেখে সেদিকে এগোয়
প্রত্যুষ। চম্বল এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে। কয়েকটা ছাগল বাঁধা আছে এক জায়গায়। তাঁবু গুলোর
কাপড় বেশ মোটা, ধুসর রঙের। ওপরটা ছুঁচোলো।
দুটো লোক বেরিয়ে এসেছে একটা তাঁবু থেকে। একজন
লোক বেশ ফর্সা, টিকোলো নাক, কালো ঢেউ খেলানো চুল। বাকিজনের রঙ তামাটে, যেন রদ্দুরে
পোড়া, ছোট ছোট চোখ। দুজনের পরনে একই রকমের কামিজ, গোলাপী রঙের। একজনের হাতে একটা কাপড়ের
বান্ডিল। লোকদুটো তাকিয়ে দেখলো, কিন্তু কিছু বললো না।।
এরা কি সত্যিই মধ্যযুগের মানুষ?
চম্বল ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। তামাটে লোকটা দাঁড়িয়ে
ওদের দেখছে।
কিন্তু প্রত্যুষ এগিয়ে চলছে, চম্বল তারাতারি
পা মেলায়। দূরে ছাগল ডাকছে।
তাঁবু গুলোর ফাঁক দিয়ে ওরা বেরিয়ে আসে একটা
চওড়া রাস্তায়, দু’সারি তাঁবুর মধ্যের একটা পায়ে চলা পথ। এখানে বেশ কিছু লোক। কেউ দাঁড়িয়ে
গল্প করছে। একজন লোক লাঠি খেলা দেখাচ্ছে, তাকে ঘিরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে।
চম্বলের পাশেই একটা লোক বেরিয়ে আসে তাঁবু থেকে।
চেঁচিয়ে কাকে যেন ডাকে। লোকটার সরু গোঁফ আর ছোট ছোট চুল।
প্রত্যুষ এগোতে থাকছে, চম্বল দাঁড়ায় না। পাশে
মিস্টার চেঙ্গিস চুপচাপ হেঁটে চলেছেন, পেছনে পল্টন ও তাই।
দ্বিতীয় সারির তাঁবু পেরিয়ে আবার খানিকটা খোলা
জায়গা। দুটো পালোয়ান লোক মুগুড় জাতীয় কিছু একটা নিয়ে লড়াই করছে। দর্শকদের মধ্যে একজন
একটা ঢাল ছুঁড়ে দেয় দুজনের দিকে। এবার দুজনেই লড়াই করতে করতে সেই ঢালটা তোলার চেষ্টা
করছে।
কিসের পোড়া গন্ধ নাকে আসে চম্বলের। পাশেই আগুন
জ্বলছে, তার ওপর গাছের ডাল দিয়ে মাচা বানিয়ে কি যেন ঝলসে রান্না হচ্ছে। ছাগল বলেই মনে
হয় চম্বলের।
চিঁহিইইইই...।
চমকে লাফিয়ে ওঠে চম্বল।
একটা ঘোড়া প্রায় গায়ে উঠে পড়েছিলো। পল্টন চম্বলকে
ঠিক সময়ে টেনে সরিয়ে না নিলে চম্বল পড়েই যেত। ঘোরসওয়ার চম্বলের দিকে তাকিয়ে জোরে হেসে
ওঠে। লোকটার পরণে একটা পাজামা আর উর্ধাঙ্গে শুধুই একটা চামড়ার বর্ম। মুখে একগাল চাপদাড়ি।
আরো এগিয়ে চলে প্রত্যুষ। এক জায়গায় কয়েকটা
মুরগি চম্বলের পাশ দিয়ে চলে যায়। দুটো লোক সেগুলোকে তাড়া করেছে।
কে যেন গান করছে, কারা হাততালি দিচ্ছে।
অনেকগুলো বর্ম একজায়গায় জড়ো করে রেখেছে কারা।
একজন লোক সেদিকে আঙুল দেখিয়ে দুটো ছোটো ছেলেকে বকছে।
যেখানে সেখানে ঘোড়া, ছাগল, মুরগি, হাঁস। যেখানে
জঞ্জাল জমা হয়েছে সেখানে শুয়োরের পাল ঘুরছে। জঞ্জালের রঙ কেমন ধুসর বাদামী। কোন রঙ্গিন
প্লাস্টিক, প্যাকিং বাক্স, উজ্জ্বল রঙের ছেঁড়া জামা - কিচ্ছু নেই। কোনো কোক পেপসির
বোতল নেই।
এক জায়গায় অনেক মুরগির পালক। পাশে বসে একটা
লোক একটা শালপাতায় কি খাচ্ছে। তার কপাল থেকে ঠোঁটের কোনা অব্দি একটা কাটা দাগ।
কত রকমের লোক চারিদিকে! কারুর চোখ ছোট, কারুর
চোখে কাজল পড়া, কারুর লম্বা দাড়ি, কারুর দাড়ি গোঁফ কামানো, কারুর আবার সরু পেন্সিলের
মত ছুঁচলো গোঁফ। অনেককেই দেখতে মঙ্গোলদের মত, কিন্তু সবাইকে নয়। বেশ অনেকের চেহারা
মধ্যপ্রাচ্যের লোকেদের মত। যেন ইরান বা আরবদেশ থেকে এসেছে।
কারুর মাথায় বিশাল পাগড়ি, তবে ঠিক সর্দারজিদের
মত নয়।
আর কত রকমের অস্ত্র। কত রকমের তরোয়াল, ঢাল,
লাঠি, মুগুর, গদা, বর্শা, বল্লম আরো নাম না জানা কত কি! ওই যে একদল তিরন্দাজ অনুশিলন
করছে। একটা লোক একটা সুন্দর সুসজ্জিত ঘোড়ার ওপর বসে তাদের এলেম পরীক্ষা করছে।
চম্বল নিজেকে চিমটি কাটে। ও কি সত্যিই অতিতে
এসে পড়েছে নাকি সবটাই স্বপল? এই তো সকালেই বারুইপুর স্টেশানের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো।
আর এখন সে কোথায়, কবে! আর ওর সামনে - এ কি সত্যিই্ল?আকবরের সৈন্যদল? এইরকম ছিলো তাহলে
মুঘল সেনা!
“ঘোড়া দরকার,” প্রত্যুষ বলে ওঠে। “নাহলে পৌঁছতে
পারব না।”
“ঘোড়া কোথায় পাবে?” পল্টন পেছন থেকে বলে।
চম্বলের মনে হয় যেন বাংলা ভাষাটাই এখানে বেমানান।
প্রত্যুষ বলে, “ধার নেবো। মিস্টার চেঙ্গিস,
আপনি কোনো একটা আস্তাবলের লোককে বোঝাতে পারবেন, যে আমরা বিশেষ প্রয়োজনে আকবরের কাছে
বার্তা পৌঁছোতে এসেছি? দুটো ঘোড়া ধার চাই আধঘন্টার জন্য?”
“চেষ্টা করে দেখতে পারি। যদি জিজ্ঞাসা করে
কোথা থেকে আসছেন?”
“আমি ফিল্ড রিসার্চারের সাথে কথা বলে জানাচ্ছি।”
প্রত্যুষ ঝোলা থেকে কানে লাগানোর যন্ত্রটা
বার করে। তারপর মিস্টার চেঙ্গিসের সাথে জায়গা বদল করে। এখন ওর ডানদিকে চম্বল। ডানদিকের
কানে যন্ত্রটা লাগায় প্রত্যুষ। চম্বল বুঝতে পারে, এই যন্ত্রটা এখানের লোকেদের দেখতে
দেওয়া যাবে না। ও আরেকটু ঘেঁষে আস প্রত্যুষের
দিকে।
প্রত্যুষ অলরেডি কথা বলতে শুরু করেছে। “ফিল্ড
টু কমিউনিকেশান। অহনা, শুনতে পাচ্ছিস?”
“সাবধান, হাতি,” পল্টন পেছন থেকে বলে ওঠে।
পাশেই দুটো কাঠের গাদা, আর তার মাঝে একটা হাতি।
তবে বাচ্চা। চম্বল ভয় পায় না, বরং ইচ্ছা হয় ওর শুঁড়ে একবার হাত বুলিয়ে দিতে। কিন্তু
হাতির পেছনে একটা লোক এসে পড়েছে, মাহুত হবে নিশ্চয়ই। সেই লোকটা কম করে সাড়ে ছ’ফুট লম্বা।
মাথা চকচকে নেড়া, পরে আছে শুধু একটা চামড়ার পাজামা এবং তার কোমড়ে একটা এক হাত লম্বা
ছোড়া। লোকটার হাতে একটা চাবুক। কুতকুতে চোখ নিয়ে লোকটা ভুরু কুঁচকে ওদের দিকে তাকাচ্ছে।
চম্বল আর কোনো চেষ্টা করে না হাতিকে আদর করার। ওই লোক যদি তারপর উলটে আদর করতে আসে...
প্র্ত্যুষ কথা শেষ করে মিস্টার চেঙ্গিসকে বলে,
“আপনি বলবেন আমরা বাংলার লোক, এখন আসছি তুঘলকাবাদ হয়ে। আকবরের প্রতিপক্ষ হেমু ও বাংলায়
থাকতেন আর কয়েকদিন আগেই তুঘলকাবাদ দখল করেছেন। সুতরাং এইসব জায়গার নাম নিলে ব্যাপারটা
সিরিয়াস শোনাবে। একটু এরকম ভাব দেখাবেন যে, আমাদের যদি ঘোড়া না দেয় তাহলে পরে সোজা
আকবরের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।””
আস্তাবল খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। একটু দূরে দূরেই
এক এক জায়গায় কয়েকটা করে ঘোড়া বাঁধা আছে, তবে লোকও আছে সঙ্গে। কেউ খাওয়াচ্ছে, কেউ পরিস্কার
করাচ্ছে, কেউ তত্ত্বাবধান করছে।
সেইরকম একটা আস্তাবলের সামনে দাঁড়ায় ওরা। চারটে
ঘোড়া বাঁধা আছে, আর দুটো লোক একটা উল্টোনো কাঠের বাক্সের ওপর বসে নিজেদের মধ্যে কথা
বলছে। একজনের কালো কামিজের ওপর হলুদ রঙ দিয়ে নকশা করা। বাকিজনের পোশাকে এত শুকনো কাদা
যে কোথায় কি রঙ বোঝা মুশকিল। তবে তার পায়ের কাছে একটা লাঠি রাখা, যার রঙ টুকটুকে লাল।
মিস্টার চেঙ্গিস এগিয়ে যান কথা বলতে। ওরা তিনজন
একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়ায়। এই ভাষা তিনজনের কেউ বোঝে না সেটা না দেখালেই ভালো।
“কি চম্বল, কিরকম লাগছে?” প্রত্যুষ বলে।।
“জেগে আছি না স্বপ্ন দেখছি বুঝতে পারছি না,”
চম্বল বলে। “এরা সত্যিই মুঘল সেনা?”
“একেবারে হানড্রেড পারসেন্ট মুঘল সেনা। এটা
মাত্র একটা ছাউনি, এরকম আরো অনেকগুলো আছে।””
“আর এদের প্রতিপক্ষ?”
“হেমুর বাহিনী? তারাও আছে অন্য কোনো দিকে,
ফাঁকা যায়গায় গেলে দেখা যাবে।”
“যুদ্ধ কবে হবে?” পল্টন জিজ্ঞাসা করে।
“কাল সকালে,” প্রত্যুষ বলে। “কাল বিকেলের মধ্যে
শেষ হয়ে যাবে।”
“কারা জিতবে?”
“এরাই জিতবে। দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে মুঘলরাই
জিতেছিলো।”
মিস্টার চেঙ্গিস কথা সেরে ফিরে এসেছেন। বলেন,
“ওরা ঘোড়া দিতে রাজি আছে, বিশ্বাস করেছে আমরা দূত, কিন্তু বুঝতে পারছে না আমরা ঘোড়াটা
ফেরত দেবো কিনা। বলছে কাউকে একটা এখানে বসে থাকতে হবে, যতক্ষণ না ঘোড়া ফেরত আসে।”
“পণবন্দি রাখতে চায়?” প্রত্যুষ বলে।
“হ্যাঁ। অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু
মানলো না। খালি বলছে ঘোড়া চুরি গেলে পয়সা কে দেবে।”
“আমি থাকছি,” পল্টন বলে। “তোমরা ঘুরে এসো।”
আর উপায় নেই দেখে প্রত্যুষ রাজি হয়ে যায়। বলে,
“তুই একা না, মিস্টার চেঙ্গিসও থেকে যান। আমরা দু’জন যাই। চম্বলের ঘোড়ায় চড়ার শিক্ষাটা
আজ কাজে আসুক।”
যে লোকটার গায়ে অনেক কাদা, সে উঠে একটা বাদামী
রঙের ঘোড়া নিয়ে আসে ওদের সামনে। চম্বল গায়ে হাত বুলিয়ে দেখে। অত্যন্ত স্বাস্থবান ঘোড়া।
গা চকচকে।
এক লাফে উঠে পড়ে চম্বল। ঘোড়াটা একবার নাক দিয়ে
আওয়াজ করে চুপ হয়ে যায়। প্রত্যুষ লাফিয়ে ওর পেছনে উঠে বসে। বলে, “চল। সোজা গিয়ে মাঠে
পড়ে বাঁদিকে এগো।”
তুমি থেকে তুই-তে চলে এসেছে প্রত্যুষ। চম্বল
খুশিই হয়। ঘোড়াটার পেটে চাপ দিয়ে চলতে শুরু করে।
একটু সোজা যাওয়ার পরেই ছাউনিটা শেষ হয়ে যায়।
খোলা মাঠের মধ্যে দিয়ে এগোয় চম্বল।
“একটু তারাতারি চল।”
চম্বল গতি বাড়ায়। ঘোড়াটা অত্যন্ত দক্ষ। হবে
নাই বা কেন? সারা জীবনই ও সওয়ারি পিঠে নিয়ে মাঠে বনে দৌড়েছে।
ঝোপঝাড় বা ছোটখাটো নালা অনায়াসেই লাফিয়ে পেরিয়ে
যাচ্ছে ঘোড়াটা। চম্বলের নিজেকেই মুঘল যোদ্ধা মনে হতে থাকে। এই সময়ে হাতে একটা খোলা
তলোয়ার থাকলে...
“কোথায় যাচ্ছিস? আকবর বাঁদিকে।” প্রত্যুষ কানের
পেছন থেকে বলে।
বাঁদিকে আকবর? চম্বল থতমত খেয়ে ঘোড়ার মুখ ঘোরায়।
বাঁদিকে কিছু গাছের ওপাড়ে একটা মাঠ, আর তার
অন্যদিকে অনেক সৈন্য সামন্ত। তাদের সামনে একটা হাতি, ওপরে ছাতা।
কিন্তু কেউ নড়ছে না। পুরো সৈন্যবাহিনী দাঁড়িয়ে।
“দাঁড় করা, চম্বল। আমি একটা গাছে উঠে দেখি।
মনে হচ্ছে বাহিনী সমাধিস্থলে পৌঁছে গেছে।”
চম্বল ঘোড়াটাকে একটা লম্বা গাছের খুব কাছে
নিয়ে যায়। ঘোড়াটাও অমনি গাছ ঘেঁষে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। প্রত্যুষ ঘোড়ার ওপর থেকেই
গাছের একটা ডাল পাকড়ে নিয়ে লাফ দিয়ে গাছে উঠতে থাকে।
চম্বল ঘোড়াটার পিঠেই বসে আছে। ওর একদিকে গাছের
ফাঁক দিয়ে মাঠ দেখা যাচ্ছে, অপরদিকে একটা পুকুর। পুকুরের ওপাশে হালকা জঙ্গল। জঙ্গলের
একটা গাছে একটা ঘোড়া বাঁধা আছে, চম্বলের চোখে পড়ে। কিন্তু কেউ নেই।
প্রত্যুষ ওপরের একটা ডালে পা ঝুলিয়ে বসেছে।
পুকুরের ওপাড়ে কি যেন নড়ছে। আরেকটা ঘোড়া বেরিয়ে
আসছে গাছগুলোর পেছন থেকে। ঘোড়ার ওপরে একজন বসে আছে। তার মাথায় একটা ছূঁচোলো শিরস্ত্রান।
লোকটা চম্বলের দিকে তাকিয়ে আছে।
চম্বল ওপরে তাকায়। প্রত্যুষ চোখে দূরবীন লাগিয়ে
বসেছে। ওপর থেকে নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছে কি ঘটছে।
একটা চাপা শিষের শব্দ। চম্বল পুকুরের দিকে
তাকায়। ঘোড়ায় বসা লোকটা শিষ দিয়েছে। কাউকে ডাকছে?
হ্যাঁ। ওটা ডাকই। আরেকটা লোক বেরিয়ে এসেছে
গাছের পেছন থেকে। ঘোড়ার ওপরের লোকটা তাকে কি যেন বলছে।
চম্বল আবার ওপরে দেখে। প্রত্যুষ ঝোলার মধ্যে
কি যেন খুঁজছে। তারপর একটা কাগজ বার করে। ম্যাপ বোধহয়। আবার দূরবীন চোখে তুলেছে এবারে।
ওদিকে দ্বিতীয় লোকটাও এবারে বাকি ঘোড়াটার ওপরে
উঠে বসেছে। এরও মাথায় একটা শিরস্ত্রান, তবে অতটা ছুঁচলো নয়। লোকদুটো পাশাপাশি ঘোড়ার
ওপর বসে আছে। ঘোড়া দুটো মাথা নিচু করে ঘাস খাচ্ছে।
একটা লোকের কোমড়ে একটা বড় বাঁকা তলোয়ারের মত
কিছু।
লোকদুটো চলতে শুরু করেছে। কিন্তু আবার দাঁড়িয়ে
গেছে। কারণ দ্বিতীয় লোকটা ওর ঘোড়ার দড়িটা খুলতে ভুলে গেছিলো। সে লাফিয়ে নেমে দড়ি খুলছে।
বাকি লোকটা চম্বলকে দেখছে।।
খচরমচর আওয়াজ আসে চম্বলের ওপর থেকে, শুকনো
পাতা পড়তে থাকে একগাদা। তারপর প্রত্যুষ নেমে আসে। সব থেকে নিচু ডালটা থেকে ঝাঁপ দিয়ে
মাটিতে পড়ে।
প্রত্যুষ উঠে দাঁড়ানোর আগেই ঘোড়া ঘুরিয়ে নিয়েছে
চম্বল। শব্দব্যয় না করে হাত বাড়ায় প্রত্যুষের দিকে। প্রত্যুষ বোঝে কিছু একটা হয়েছে।
কোনো প্রশ্ন না করে লাফ মেরে উঠে আসে চম্বলের পিছনে।
পুকুরের ওপাড়ে দ্বিতীয় ঘোড়াটার দড়ি খুলে ঘোড়ার
ওপর উঠে বসেছে লোকটা। চম্বল আর না দাঁড়িয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। এবং সঙ্গে সঙ্গে লোকদুটোও
ঘোড়া ছোটাতে শুরু করে।
“ধরে বোসো,” চম্বল প্রত্যুষকে বলে। যদিও বলার
দরকার ছিলো না। প্রত্যুষ লোকদুটোকে দেখতে পেয়েছে।
জোর ছুটছে ঘোড়াটা, রাস্তাটাও পায়ে চলে চলে
বেশ শক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এই রাস্তা খুব বেশিক্ষণ নয়। একটু পরেই খানা খন্দ ঝোপ ঝাড়
শুরু হয়ে যায়। পেছনে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনতে পায় চম্বল। ওরা তারাতারি এগিয়ে আসছে।
এরা কি ডাকাত না মুঘলদের শত্রুপক্ষ? যেই হোক,
এদের উদ্দেশ্য ভালো ঠেকছে না।
পথ বদলায় চম্বল। প্রকাশ্যে ডাকাতির সম্ভাবনা
কম। গাছগুলোর মধ্যে ফাঁক খুঁজে সুযোগ বুঝে ঘোড়াটাকে নিয়ে রাস্তাটার থেকে বেরিয়ে আসে।
এবার খোলা মাঠ। ডানদিকে দূরে আকবরের সৈন্য আর বাঁদিকে খানিকটা দূরে ছাউনি। চম্বল ছাউনির
দিকে মুখ ঘোরায়। দূরে তাঁবুগুলোকে যেন একটা ধূসর দেওয়ালের মত দেখাচ্ছে।
লোকদুটোও বেরিয়ে এসেছে মাঠের মধ্যে, ওদের একটু
পেছনেই এখন।
আর পেছন দিকে না তাকিয়ে ঘোড়ার পেটে চাপ দেয়
চম্বল। চল, যত জোরে পারিস। আওয়াজ শুনে বুঝতে পারে যে প্রত্যুষ তার খাপ থেকে ছোড়াটা
বার করে নিয়েছে।
কিন্তু লোকগুলো পিছিয়ে পড়ছে। ভরসা পায় চম্বল।
দু’হাত দিযে লাগাম কষে ধরে, গতি কমায় না। আস্তে আস্তে কাছে আসছে ছাউনিটা।
“ওরা আক্রমন করবে না মনে হয়,” প্রত্যুষ বলে।
“মনে হচ্ছে ফলো করছে।”
চম্বল ঘুরে দেখে। লোক দুটো একটা নির্দিষ্ট
দূরত্বে গতি মিলিয়ে এগোচ্ছে। তাড়া করার মত লাগছে না আর। চম্বল ঘোড়ার গতি সামান্য কমায়।
আস্তাবল অব্দি লোকদুটো পেছনে আসে, তারপর কোথায়
যেন মিলিয়ে যায়। প্রত্যুষ বলে, “ওরা আমাদের ঘোড়া চোর ভেবেছিলো। হয়তো ওরা এই শিবিরেরই
সৈন্য। যখন দেখলো ঘোড়া ফেরত দিচ্ছি, তখন চলে গেলো।”
তাই হলেই ভালো, চম্বল ভাবে। “প্রথমে যেভাবে
পিছু নিয়েছিলো, মনে হচ্ছিলো ধরতে পারলেই ঘচাং।”
“সেটা হতেও পারতো। এই যুগে লোকে শুধু সন্দেহবশত
অনেক ঘচাং করেছে।” প্রত্যুষ বলে। “তুই জোরে ছুটিয়ে ঠিক করেছিস।”
আস্তাবলে পৌঁছে দেখা যায় পল্টন আর পরিস্কার কামিজ পড়া লোকটা মাটিতে ঘর কেটে
কয়েকটা পাথরকে ঘুঁটি বানিয়ে কিসব খেলছে। বাকি লোকটা আর মিস্টার চেঙ্গিস মন দিয়ে দেখছেন।
“তুই আবার লেগে পড়েছিস!” প্রত্যুষ পল্টনকে
বলে। “চল এবার, ফিরতে হবে। কাজ হয়ে গেছে।”
চম্বল ঘোড়ার রাশটা একজনের হাতে দিয়ে দেয়। তারপর
ঘোড়াটার পিঠে একটা চাপড় দিয়ে লোকটাকে বলে, “দারুন ঘোড়া।”
লোকটা বুঝতে পারে ও কি বলতে চাইছে। একগাল হেসে
ঘোড়াটার পিঠে চাপড় মারে। কি যেন বলে। চম্বলও হেসে মাথা নাড়ে।
“আর পাঁচ মিনিট দিলে খেলাটা শেষ হত,” পল্টন
অভিযোগ করে। তার প্রতিপক্ষ খুব একটা দুঃখ পেয়েছে বলে মনে হল না। পল্টন জিতছিলো বোধহয়।
“চল এখন, অনেক হয়েছে।” প্রত্যুষ ছাউনির পেছনের
জংগলের দিকে এগোতে শুরু করে। বাকিরা ওর পিছু নেয়। “আমাদের মিশান সাকসেসফুল। ওই যে হাতিটা
দেখলি চম্বল, আকবরের সৈন্যদের মধ্যে? ওটাই আকবরের হাতি। আমি দূরবীন দিয়ে আকবরকে দেখতে
পেয়েছি। কিছু ঝোপঝাড়ের পাশে একটা জায়গায় তলোয়ারটা পোঁতা হয়েছিলো, যা বুঝলাম। যায়গাটা
ম্যাপে দাগিয়ে নিয়েছি।””
“আকবর বুঝতে পেরেছে, যে তলোয়ার নেই?”
“একটা সোরগোল পরে গেলো, সেটা বুঝতে পারলাম।
অনেকে উত্তেজিত হয়ে ছুটোছুটি করছিলো। তারপর আর দেখিনি।”
ছাউনির শেষে এক পাল মুরগি পেরিয়ে আবার সেই
জঙ্গলটা। একটু ঢুকে গিয়ে দাঁড়ায় সবাই। প্রত্যুষ কান খাড়া করে শোনে কেউ আশপাশে আছে কিনা।
তারপর কানের যন্ত্রটা বার করে লাগায়। বলে, “ফিল্ড টু কন্ট্রোল। উই আর রেডি টু কাম ব্যাক।”