Wednesday, July 6, 2022

৩। অপারেশান সেন্টার

 করিডরটার দুদিকে সারি দরজা। শেষপ্রান্তে একটা দু’পাল্লার দরজা। বেশিরভাগ গুলোই বন্ধ। শেষের ডানদিকের দরজাটা খোলা, সেখান থেকে কিছু গলার আওয়াজ আসছে। ডক্টর বৈদ্য চম্বলকে সেই ঘরটাতে নিয়ে যান। ঘরটা অনেকটা অফিসের মিটিং রুম গোছের। মধ্যে একটা বড় লম্বা টেবিল, তাকে ঘিরে বেশ কিছু চেয়ার। একপ্রান্তে একটা বোর্ড।

ঘরের মধ্যে দুটি লোক এবং একটি মেয়ে বসে কথা বলছিলো। ডক্টর বৈদ্য ঘরে ঢুকে বলেন, “আলাপ করিয়ে দিই, আমাদের নতুন রিক্রুট চম্বল। কালকে তোমাদের যার কথা বলেছিলাম। এই মিশন থেকেই ও ফিল্ড এজেন্ট হয়ে কাজ করবে।”

ঘরের তিনজন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। ডক্টর বৈদ্য পরিচয় করিয়ে দেন।

“এই হল প্রত্যুষ, ফিল্ড লিডার।”

একটি পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছরের লম্বা পেটানো চেহারার ছেলে এগিয়ে এসে চম্বলের সাথে করমর্দন করে চম্বলের পিঠে হাত রাখে। বলে, “ওয়েলকাম, চম্বল।”

চম্বল ধন্যবাদ জানায়।

ডক্টর বৈদ্য বলেন, “এই হচ্ছে অহনা। ও আমাদের ফিল্ড রিসার্চার। আর পল্টন তোমার মতই ফিল্ড এজেন্ট।”

দুজনেই চম্বলের সাথে করমর্দন করে। অহনা বলে, “তোমার নিশ্চয়ই এখন মাথাটা বনবন করে ঘুরছে। চিন্তা নেই, সবারই প্রথমে ওরকম হয়। আমারও হয়েছিলো।”

পল্টন চম্বলের হাত ধরে বলে, “ব্রাদার, আমিও ফেন্সিং জানি। একবার হয়ে যাক?”

“পরে হবে,” ডক্টর বৈদ্য নিরস্ত করেন। “এখন বোসো। বোসো চম্বল।”

চম্বল বাকি সবার মত একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে।

ডক্টর বৈদ্য বলেন, “তোমরা কেস ব্রিফিং অলরেডি পেয়েছ, কিন্তু চম্বল এখনো জানে না। আমি ওর জন্য আবার সংক্ষেপে বলছি। চম্বল, পানিপথের প্রথম যুদ্ধ কার সাথে কার হয়েছিলো মনে আছে?”

একটা তো বাবর, সেটা এক্ষুনি জানা গেছে। আরেকটা কে? সেই কে একটা যেন পাগলা রাজা ছিল?

“বিন তুঘলক?” চম্বল চান্স নেয়।

“না, তিনি আরো আগের যুগের লোক। বাবর লড়েছিলেন ইব্রাহিম লোদির বিরুদ্ধে। যুদ্ধের ঠিক প্রাক্কালে একজন জ্যোতিষি বাবরকে বলেন, যে তাঁর প্রিয় তরোবারিটি অপয়া হয়ে গেছে। ওইটি থাকলে তিনি যুদ্ধে জিততে পারবেন না। বাবরের সৈন্যসংখা এমনিতেই লোদির থেকে অনেক কম ছিল। বাবর চিন্তায় পড়ে গেলেন। তখন সেই জ্যোতিষি আরো বললেন যে, ওই অপয়া তরোয়াল নিয়ে যুদ্ধে নামলে শুধু যে রণে ভঙ্গ দিতে হবে তাই নয়, তার সাথে বাবর তার পুত্র এবং সেনাপতি হুমায়ুনকেও চিরতরে হারাবেন। বাবর এতবড় ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। তিনি তার পরমপ্রিয় তরবারিটিকে শুধু যে পরিত্যাগ করলেন তাই নয়, তাকে সমাধিস্ত করলেন। কিন্তু গোপনে। এই কথা জানলো শুধু হাতে গোনা কয়েকজন। তার পরের দিন বাবর লোদির প্রায় পাঁচগুণ বড় সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে যুদ্ধে জিতলেন।”

“তলোয়ারের অশুভ শক্তি দূর হওয়ার দরুন?” চম্বল অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে।

“না,” ডক্টর বৈদ্য বলেন। “বাবরের রণকৌশলের দরুন। যুদ্ধে জিতে বাবর সাম্রাজ্য প্রতিষ্টা করলেন। তারপরে কেটে গেল তিরিশ বছর। আবার পাণিপথে দুই সেনাবাহিনী মুখোমুখি। এবার কিন্তু অন্যলোক। মনে আছে চম্বল, পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ কারা লড়েছিল?”

এই রে, আবার?

“ব্রিটিশরা?” চম্বল আবার অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ে।

“ব্রিটিশ!” ডক্টর বৈদ্য আকাশ থেকে পড়েন। “তখন ব্রিটিশ কোথায়? সবে তো মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে। দ্বিতীয় যুদ্ধটি হয় আকবর এবং সম্রাট হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য বা হেমুর মধ্যে।”

“এসব কি কারুর মনে থাকে স্যার?” চম্বল প্রতিবাদ করে। “আমি তো অ্যাাপ্লাই করেছিলাম সিনেমায় নামার জন্য।“

চম্বলের কথা যেন শুনতেই পাননি এমন ভাবে ডক্টর বৈদ্য বলতে থাকেন, “যুদ্ধটা আকবর এর নামে ঘটে, কিন্তু আকবর নিজে ছিলেন না। কারণ আকবরের বয়েস তখন তেরো। তাঁকে লড়াই করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পাঁচ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী আকবর কে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব নেয়। তাদের কাছে নির্দেশ দেওয়া ছিল যে, মুঘল বাহিনী যদি হারতে শুরু করে তবে তারা তৎক্ষণাৎ আকবরকে নিয়ে কাবুলের পথে রওনা হয়ে যাবে। কাবুল মুঘলদের জায়গা, সেখানে হেমু পৌঁছতে পারবেন না। এই অব্দি ঠিক আছে?”

চম্বল মাথা নাড়ে।

“অহনা, তুমি তাহলে ওকে বাকিটা বলে দাও”। ডক্টর বৈদ্য বলেন। “আমি একটু দোভাষী বাবুর সাথে কথা বলে আসি।”

ডক্টর বৈদ্য উঠে গেলে অহনা বলতে শুরু করে। “যুদ্ধের আগের দিন কিশোর আকবর ভয়ানক গোঁ ধরে। সে যুদ্ধ করবেই, সে কিছুতেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে বসে থাকবে না। অনেক বোঝানোর পর - এবং খানিকটা হালকা বকা-ধমকের পর আকবর একটু বাধ্য হন কিন্তু পরিস্কার জানান যে, তাকে যদি যুদ্ধ করতে না দেওয়া হয় তাহলে অন্তত তাকে তার ঠাকুরদার তরোয়ালটা এনে দিতে হবে মাটি খুঁড়ে। সে প্রচন্ড বায়না – জিনিসপত্তর ভাংচুর, চেচামিচি, কান্নাকাটি। শেষে আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁ বাধ্য হয়ে মেনে নেন। একজন বিশ্বস্ত অনুচরের কাছে তরোয়ালটার সমাধিস্থলের নির্দেশিকা দিয়ে আকবরের বডিগার্ড বাহিনীকে দায়িত্ব দেন, আকবরকে যথাস্থানে নিয়ে গিয়ে তলোয়ারটি মাটি খুঁড়ে বার করে দিতে।

“কিন্তু সেইখানে পোঁছেই লাগল ধাক্কা। সমাধি ফাঁকা। তলোয়ার কেউ আগেই বার করে নিয়েছে।”

“চুরি হয়ে গেছে,” চম্বল বলে। “খুব স্বাভাবিক।”

“হ্যাঁ, কিন্তু তখন কেউ চুরির কথা ভাবলোনা। সবাই ধরেই নিল যে বাবর নিজেই যুদ্ধের পরে কখনো গোপনে কবর খুঁড়ে তার প্রিয় অস্ত্রটি বার করে নিয়েছিলেন এবং তারপরে কোথাও সরিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে লোকে তাঁর দুর্বলতার কথা জানতে না পারে। এই কয়েকদিন আগে অব্দি ঐতিহাসিকরাও সেটাই সত্যি বলে ভাবতেন। একদল লোক কাবুলে বাবরের সমাধি খুঁড়ে দেখার কথাও বলেছিলো। কেউ আবার বলতো, ওটা আসলে মুঘলদের কাছেই ছিলো, পরে ব্রিটিশরা চুরি করে নিয়েছিলো। আবার লোকে এমনও বলেছে যে, কিশোর আকবর নিজেই লুকিয়ে দিয়েছিলো। মোট কথা ওটা কোথাও লুকানো আছে।

“কিন্তু সেই ধারণাটা বদলে গেলো কয়েকদিন আগে একটা পুঁথি আবিস্কার হওয়ার পরে। সেই পুঁথিতে এক ব্যক্তি স্পষ্ট করে জানাচ্ছে যে সে নিজে হাতে আরো কয়েকজন সাকরেদ সহযোগে বাবরের তলোয়ার চুরি করেছিলো। সেই জ্যোতিষির সাথেও এদের ষড় ছিলো। কিন্তু লোকটা দুঃখ করছে এই বিষয়ে, যে তলোয়ারটা লুকিয়ে রাখা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেই অনেক লড়াই হয়েছে এবং শেষে তরোয়ালটি হারিয়েই গেছে। ইন্টারেস্টিং হচ্ছে তাদের চুরি করার সময়টাও। তাদের নিজেদেরও মনে হয়েছিলো যে যুদ্ধ জিতলে বাবর ওটা আবার উদ্ধার করে নেবেন। তাই তারা সেই সুজোগ না দিয়ে প্রথম যুদ্ধের আগের রাত্রেই – অর্থাৎ বাবর তলোয়ারটা সমাধিস্থ করার কিছুক্ষণ পরেই সেটি চুরি করে নেয়।”

“বাবরের ওপর কারুর ভরসা ছিলো না দেখছি,” পল্টন বলে ওঠে।

“যোদ্ধা রাজাদের কাছে তাদের ঘোড়া আর তলোয়ার তাদের প্রাণের থেকেও প্রিয় হত,” প্রত্যুষ পল্টন কে বলে।

অহনা বলে, “তাহলে দেখলে চম্বল, ব্যাপারটা পুরো বদলে গেলো। যে বস্তুটি বাবর বা আকবর লুকিয়েছিলেন অথবা ব্রিটিশরা নিয়ে গেছিল, সেই বস্তুটি খুঁজে পাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যে জিনিস আজ থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আগে চুরি গেছে এবং চোরেরাই হারিয়ে ফেলেছে বা হয়তো নষ্টই করে ফেলেছে, তাকে কি আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব?”

“তাহলে কি কর্তব্য?” চম্বল বলে। “তরোয়ালটা চুরি যাওয়ার আগেই নিয়ে আসতে হবে?”

“হ্যাঁ, কিন্তু বাবরের নাকের ডগা থেকে নিয়ে আসা সম্ভব নয়,” প্রত্যুষ বলে। “ধরা পড়লে ওই তলোয়ার দিয়েই গলা কেটে দেবে।”

“তাহলে?”

“তাহলে তলোয়ারটা সমাধি দেওয়ার পর থেকে চুরি যাওয়ার আগে অব্দি কোনো একটা সময় সেটাকে উদ্ধার করতে হবে। বলতে পারো, চোরেদের আগে চুরি করে আনতে হবে।”

চম্বল মাথা নাড়ে। রাত্তিরের অন্ধকারে মাটি খুঁড়ে তলোয়ার বার করাটা খুব অসম্ভব কাজ নয়। সবাই মিলে চেষ্টা করলে হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই সমাধিস্থলে কোনো পাহাড়াদার থাকবে না? এত প্রিয় তলোয়ার বাবর নিশ্চয়ই বন বাদাড়ে পুঁতে দিয়ে আসেননি।

“সমাধিস্থলটা কিরকম জায়গায়?” চম্বল জিজ্ঞাসা করে।

“নো আইডিয়া।” ডক্টর বৈদ্য কখন আবার ফিরে এসেছেন। সঙ্গে আরেকজন রোগা করে মোটা গোঁফওয়ালা লোক। লোকটি একটি চেয়ার টেনে বসে। ডক্টর বৈদ্য একটা চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে চেয়ারটার পিঠে হাত রেখে বলেন, “বাবর তলোয়ারটাকে কোথায় পুঁতেছিলেন, তা আমরা জানি না। ইতিহাসে এর কোনো উল্লেখ নেই। আর বাবর খুব সম্ভবত খুব লুকিয়ে কাজটা করেছিলেন।”

“কিন্তু আকবর তো জানতেন!” চম্বল বলে ওঠে। “তিনি কিছু বলে যাননি?”

“একদম ঠিক কথা চম্বল, কিন্তু দুঃখের বিষয় আকবরও কিছুই বলে যাননি। সেই কারণে এখন আমাদের কাছে একটাই রাস্তা খোলা আছে। ফলো করে দেখতে হবে তরোয়াল কোথায় পোঁতা হয়েছিলো।”

“বাবরকে ফলো করতে হবে?” চম্বল একটু চিন্তায় পরে যায়।

“না। বাবর রাত্তিরের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে কখন কোথায় পুঁতেছিলেন, সেটা বার করা শক্ত।” ডক্টর বৈদ্য বলেন। “তার থেকে অনেক সিম্পল হবে আকবরকে ফলো করা। আকবর গেছিলেন দিনের আলোয়, সঙ্গে পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে। তোমরা অনেক দূর থেকেই জায়গাটা পরিস্কার বুঝতে পারবে। ভালো করে সঙ্গের একটা ম্যাপে নোট করে নেবে। তারপর তিরিশ বছর আগে বাবরের সময়ে গিয়ে ঠিক সেই জায়গাটা খুঁজে বার করে রাত্তিরবেলায় তলোয়ারটা উদ্ধার করে নিয়ে আসবে।”

“ব্যস। এটাই কাজ।” পল্টন একগাল হেসে বলে।

“টিমে কে কে থাকবে?” প্রত্যুষ ডক্টর বৈদ্যকে জিজ্ঞাসা করে।

“তুমি, পল্টন, চম্বল আর মিস্টার চেঙ্গিস।” রোগা মত ভদ্রলোকের দিকে ফেরেন ডক্টর বৈদ্য। “মিস্টার চেঙ্গিস, আমাদের নতুন টিম মেম্বারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই - চম্বল চ্যাটার্জী। চম্বল, ইনি মিস্টার চেঙ্গিস, ইনি দোভাষী হয়ে যাবেন।”

মিস্টার চেঙ্গিস নমস্কার করেন। চম্বল থাকতে পারে না। মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, “আপনার নাম চেঙ্গিস?”

“আপনার নাম চম্বল?” মিস্টার চেঙ্গিস উলটে প্রশ্ন করেন।

“হ্যাঁ, কিন্তু তার একটা কারণ আছে। আমার...”

মিস্টার চেঙ্গিস ওকে থামিয়ে দেন। বলেন, “আমার নামেরও কারণ আছে।”

মুঘল সাম্রাজ্যের সাড়ে তিনশ’ বছরের শাসনে একাধিক ভাষা প্রাধান্য পেয়েছিলো, ডক্টর বৈদ্য জানান। ফার্সী মূল ভাষা হলেও একদম শুরুতে বাদশাহরা সেই ভাষায় কথা বলতেন না। বাবর-হুমায়ুনের কথ্য ভাষা ছিল মূলত চাগাতাই তুর্কী। এই ভাষা লোপ পেয়ে গেছে গত শতাব্দিতেই। আবার মুঘল সাম্রাজ্যের শেষের দিকের ভাষা ছিলো উর্দু, যা প্রকৃতপক্ষে ফার্সী থেকেই এসেছিলো। এছাড়া ধার্মিক কারণে আরবী ভাষার প্রচলন তো ছিলোই।

“মিস্টার চেঙ্গিস যে শুধু আরবী, উর্দু  এবং ফার্সীতে পারদর্শী, তাই নয়,” ডক্টর বৈদ্য চম্বলকে বলেন, “উনি চাগাতাই তুর্কি ভাষাও লিখতে ও বলতে পারেন। তাই মুঘল আমলে যেতে হলে উনি অপরিহার্য।”

প্রত্যুষ চেয়ারটা পিছিয়ে উঠে দাঁড়ায়। “টাইম টু গো।”

বাকিরাও উঠে দাঁড়ায়।

“কোথায় যেতে হবে?” চম্বল বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করে।

“আকবরকে ফলো করতে।”

“এক্ষুনি?” চম্বল ঘাবড়ে যায়।

প্রত্যুষ মুচকি হাসে। বলে, “তুমি তো চাকরিতে জয়েন করেই ফেলেছো। এবার কাজ শুরু।”

 

করিডরের শেষপ্রান্তের দু’পাল্লার দরজাটার ওপারে একটা বসার ঘর। কিছু সোফা রাখা। একদিকে একটা আলো জ্বলা মেশিনের ভেতরে কিছু চিপস আর স্ন্যাকসের প্যাকেট আর আরেকদিকে একটা কোল্ড ড্রিঙ্কস এর ফ্রিজ। এক কোনায় একটা কফি মেশিন।

দুদিকে দুটো দরজা, দেখে ভারি মনে হয়। ডানদিকের দরজাটার গায়ে সাদা ধাতব পাতের ওপরে বেগুণী রঙ দিয়ে লেখা টি-উইং। আর বাঁদিকের দরজাটার ওপরে একই ভাবে লেখা পি-উইং।

প্রত্যুষ বাঁদিকের দরজাটার দিকে এগিয়ে যায়।

চম্বল অহনা কে জিজ্ঞাসা করে, “পি আর টি মানে?”

“টি অর্থাৎ ট্রাভেল। ওদিকেই মেশিনটা আছে। আর পি মানে প্রিপারেশান। আমরা প্রথমে সেখানে যাচ্ছি।”

বাঁদিকের দরজাটা পেরিয়ে আরেকটা করিডর, তারও দুদিকে দরজা, তবে খোলা। অহনা চম্বলকে বলে, “এখানে স্টোর আছে, চেঞ্জিং রুম আছে। মেকআপ রুমও আছে। পুরোনো যুগে যেতে হলে সেযুগের পোশাকে সেযুগের মতো চেহারা বানিয়ে যেতে হয়।”

“তুমি যাও না কখনো?” চম্বল জানতে চায়। অহনার পোস্ট ফিল্ড রিসার্চার। ও কি তাহলে শুধু গবেষণা করে।

“হ্যাঁ, যাই তো। মিশনের ওপর ডিপেন্ড করে। সেযুগে মেয়েরা যুদ্ধ করতো না, যুদ্ধক্ষেত্রের আশেপাশে খুব একটা যেতও না। আমি তোমাদের সাথে গেলে সন্দেহজনক লাগতে পারে। তাই যাচ্ছি না।”

প্রত্যুষ একসেট পোশাক ধরিয়ে দেয় চম্বলকে। বলে, “চেঞ্জিং রুমে গিয়ে পড়ে নাও।”

চম্বল একটা পায়রার খোপের মতো চেঞ্জিং রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে। পোশাক বলতে একটা ছাই রঙের কামিজ আর একটা পাজামা। পরণের জামা প্যান্টটা ছেড়ে চম্বল কামিজ আর পাজামাটা পড়ে নেয়। কামিজের কোমড়ে একটা বন্ধনী ঝুলছিলো। সেটা দিয়ে কষে বেঁধে নেয় কামিজটাকে।

নিজেকে আয়নায় দেখে চম্বল। এত সাধারণ পোশাক সাধারণত পরা হয়না। কামিজের ধরণটাও অন্যরকম। চম্বলের মনে হয় যেন কোনো নাটকে কোনো নবাবের বাড়ির কর্মচারির পার্ট করতে চলেছে। চেঞ্জিং রুম থেকে বেরোনোর পর দেখে সামনে জুতো রাখা এক জোড়া। চামড়ার জুতো, পা গলানো। মোজার বালাই নেই। জুতোটা বেশ ফাটাফুটো, ব্যবহৃত। কিন্তু পায়ে মোটামুটি ফিট হয় চম্বলের।

“ঠিক আছে?” পল্টন জিজ্ঞাসা করে।

“হ্যাঁ, চলবে।”

পাশের ঘরে একটা টেবিলের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে প্রত্যুষ একটা ম্যাপ দেখছিলো। অহনা একটা পেনসিল দিয়ে একটা জায়গা গোল করে ঘিরে দেয়। “এই অঞ্চলের মধ্যেই কোথাও একটা হবে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুয়ায়ী আকবরের সৈন্য মুঘল শিবিরের পাশ দিয়ে উত্তর পূর্ব দিকে রওনা দিয়েছিলো। এই জায়গাটাই সবথেকে সম্ভাব্য।”

প্রত্যুষ ম্যাপটা ভাঁজ করে কামিজের পকেটে ঢোকায়। তারপর অহনার থেকে পেন্সিলটাও নেয়। অহনা একটা ইলাস্টিক লাগানো চশমা বাড়িয়ে ধরে। প্রত্যুষ সেটা চোখে গলিয়ে কিছু সেটিং পরীক্ষা করে নেয়। অহনা চম্বলকে বলে, “এটা একটা দূরবীন। সিম্পল, কিন্তু ফিল্ডের জন্য খুব স্যুটেবল।”

প্রত্যুষের কোমড়বন্ধনিটা আসলে একটা ব্যাগ, চম্বল লক্ষ্য করে। কিন্তু এক ঝলকে বোঝা সম্ভব না। প্রত্যুষ দূরবীনটা তার মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়। ভেতরে আরো কিছু জিনিস রাখা আছে মনে হয়।

টেবিলের ওপর চারটে লাঠি আর কয়েকটা ছোটো ছোড়া রাখা ছিলো। প্রত্যুষ সবাইকে একটা করে লাঠি দেয়। “পছন্দ মত একটা করে ছোড়া নিয়ে নাও।”

মিস্টার চেঙ্গিস ছাড়া সবাই একটা করে ছোড়া নিয়ে কোমরবন্ধনীতে গুঁজে নেয়।

“চলো এবার। গুড লাক।”

 

পি উইং থেকে বেরিয়ে সেই বসার ঘরটা পার হয়ে এবারে টি উইং। ভেতরে ঢুকেই সামনে এক সারি কম্পিউটার টেবিল। দুজন লোক সেখানে বসে কাজ করছে। প্রত্যুষ ওদের পাশ দিয়ে এগিয়ে যায় পেছনের একটা  ছোট কাচের জানলা বসানো দরজার দিকে। সেটার ওপর নক করতে একজন লোক কাচের অন্যদিক থেকে উকি মেরে দেখেন। তারপর দরজাটা খুলে দেন।

এখানে এতজন লোক কাজ করে সেটা ওপরে বসে বোঝাই অসম্ভব। চম্বল হাঁ করে এদিক ওদিক দেখতে থাকে।

ভেতরের ঘরটা একটা কনট্রোল রুম। একপাশে কালো কাচ, অন্যদিকে একটা ছোট অফিস, গায়ে লেখা কমিউনিকেশান সেন্টার। অহনা সেদিকে দেখিয়ে চম্বলকে বলে, “আমি ওখানে থাকবো, তোমাদের সাথে যোগাযোগ রাখবো। প্রত্যুষদার কাছে রিসিভার আর মাইক্রোফোন আছে। ও জানে কোন পরিস্থিতিতে কথা বলা সেফ।”

প্রত্যুষ, চম্বল, পল্টন আর মিস্টার চেংগিস কে লাইন দিয়ে দাঁড়াতে বলেন টেকনিশিয়ান ভদ্রলোক। তারপর প্রত্যেকের জামার মধ্যে একটা বেগুনী স্টিকার লাগিয়ে দেন। চম্বল হাত দিয়ে দেখে, রাংতাও নয়, প্লাস্টিক বা রবারও নয় আবার কাগজও নয়। এটা কি জিনিস?

প্রত্যুষ নিজে থেকেই বলে, “এই বস্তুটি একটি নতুন মেটিরিয়াল দিয়ে তৈরি। এমন একটা জিনিস যার সময়ের সাথে কোনো পরিবর্তন হয় না। আর এই যন্ত্রটা পুরো টিমকে একসাথে একজায়গায় এবং এক সময় নিয়ে যেতে ও ফিরিয়ে আনতে কাজে লাগে।”

টেকনিশিয়ান ভদ্রলোক টেবিলের ওপর থেকে একটা ফোন তুলে কাকে কিসব বলেন। আরো লোক আছে নাকি ভেতরে?

অবশেষে সেই কালো কাচের পেছনে আলো জ্বলে ওঠে। চম্বল দেখে কালো কাচের পেছনে একটা ঘর, তার দেওয়াল গুলো গাঢ় লাল কাপড়ে ঢাকা।

প্রত্যুষ টিমকে নিয়ে কাচের পাশের একটা দরজা দিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢোকে। ঘরের মাটিতে লাল কালি দিয়ে একটি বৃত্ত আকা। সবাই তার মধ্যে গিয়ে দাঁড়ায়।

“সিস্টেম রেডি,” কে যেন স্পিকারে জানান। “টাইম ক্যালিব্রেশান - সিক্সটি পার্সেন্ট। কমপ্লিট। স্পেস ক্যালিব্রেশান - নাইনটি পার্সেন্ট। কমপ্লিট।”

“আশা করি একদল সৈন্যর নাকের ডগায় গিয়ে ফেলবে না,” পল্টন বলে। প্রত্যুষ ফিক করে হাসে।

“স্পেস-টাইম - ক্যালিব্রেটেড। সিস্টেম প্রাইমড ফর ভয়েজ। ওয়েটিং ফর টিমলিড’স সিগনাল।”

প্রত্যুষ হাত তুলে থাম্বস আপ দেখায়।

সুইই...শ!

সব অন্ধকার। কুচকুচে কালো। তার সাথে পেছনে ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস করে আওয়াজ। যেন খুব পুরোনো কোনো গাড়ি পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে জোরে ওঠার চেষ্টা করছে।

তারপরের হঠাৎ সব সাদা। একেবারে সাদা। পেছনে একটা ধুকধুক ধুকধুক করে আওয়াজ। অনেকটা বিয়েবাড়ির ডিজেল জেনারেটারের মতো।

চম্বল নিজের হাত পা দেখতে পায় না। পাশের কাউকেও দেখা যাচ্ছে না। শুধুই সাদা।

কিন্তু সাদাটা আস্তে আস্তে সবুজ হয়ে যাচ্ছে। আর খানিকটা খয়েরি আর কালো। রঙ গুলো আস্তে আস্তে জমাট বাঁধতে থাকে। পেছনের আওয়াজটাও বন্ধ হয়ে গেছে।

একটা পাখির কর্কশ চিৎকারে চমকে ওঠে চম্বল। কিন্তু সেটা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। রঙগুলোও আবার অস্পষ্ট হতে থাকে। সবুজ গুলে যাচ্ছে সাদার মধ্যে। ফের সেই ধুকধুক আওয়াজ, যেন জেনারেটার আবার চালু হলো। রুঙ আবার স্পষ্ট হয়।

এবারে সবুজ ও খয়েরির অনেক প্রকারভেদ দেখা যাচ্ছে। নিচে আর ওপরে মূলত সবুজ, আর চারপাশে বেশি খয়েরি ও কালো। চম্বল বুঝতে পারে তার চারপাশে গাছের অবয়ব। দেখে যে ওর হাত পাও স্পষ্ট হচ্ছে।

তারপরে পরিস্কার সুরেলা পাখির ডাক। গাছের পাতায় হাওয়ার আওয়াজ।

আওয়াজটা বন্ধ হয়ে যায়। আর জেনারেটারের প্রয়োজন নেই। চম্বলের সামনে গাছ, পেছনে গাছ। পায়ের তলায় ঘাস, আগাছা। মাথার ওপরে গাছের ফাঁক দিয়ে নীল আকাশ।

যাত্রা সম্পূর্ণ হয়েছে।


Next chapter