Wednesday, July 6, 2022

২। বারুইপুর

 বেলা এগারোটা কুড়ি।

স্টেশানের বাইরে দাঁড়িয়ে ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে চম্বল। কুড়ি মিনিট পেরিয়ে গেছে। মহিমরঞ্জন কি তাহলে সময়টা ভুল বললেন? চম্বল নিজে এসেছে পৌনে এগারোটায। তখন থেকে স্টেশানের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। মহিমরঞ্জন এলে অবশ্যই দেখতে পেতেন।

আসবে না নাকি?

একবার ঘুরে দেখা উচিৎ। চম্বল এদিক ওদিক একটু পায়চারি করে।

সাড়ে এগারোটা।

ওকে কি দাঁড়াতে বলেছিলেন মহিমরঞ্জন? মনে করতে পারেনা চম্বল ঠিক করে। একবার টিকিট কাউন্টারের সামনে থেকে ঘুরে আসবে ঠিক করে।

কিন্তু সেখানেও কেউ নেই।

একটা ফোন নাম্বার নেওয়া উচিৎ ছিলো লোকটার। এখন কি করবে?  বারোটা অব্দি দেখে ফিরে যাবে?

রাস্তার ভিড়ের মধ্যে একটা লোকের দিকে চোখ পড়ে চম্বলের। কালো স্যুট, সাদা জামা, লাল টাই, চোখে গভীর কালো চশমা। লোকটা হন্তদন্ত হয়ে টিকিট কাউন্টারের দিকে এগোচ্ছে।

না...

ওর দিকেই আসছে!

এই নিশ্চয়ই ওকে নিতে এসেছে। চম্বল দু’পা এগিয়ে যায়।

লোকটি সোজা চম্বলের সামনে এসে থামে। হাত বাড়িয়ে বলে, “গুড মর্নিং মিস্টার চ্যাটার্জী। আমার অনেকটা লেট হয়ে গেল। ভেরি সরি।”

চম্বলের মুখ হাঁ হয়ে গেছে। গলা শুনে চিনতে পেরেছে মহিমরঞ্জনকে। কিন্তু পোষাক দেখে কে চিনবে!

মহিমরঞ্জন হাত বাড়িয়েই আছেন। চম্বল করমর্দন করে। মহিমরঞ্জন বলেন, “আসুন, গাড়িটা ওদিকে দাঁড়িয়ে আছে।”

গাড়িটা একটা সাদা রঙের অ্যামবাসাডার, বেশ পুরোনো। চম্বল টুক করে নম্বরটা দেখে নেয়। গাড়ি চলতে শুরু করার পরে সেটা পাঠিয়ে দেয় টিমোর নাম্বারে।

“আপনি নিশ্চয়ই অনেক্ষণ ওয়েট করেছেন?” মহিমরঞ্জন বলেন। “আই অ্যাপলোজাইজ। ঠিক সময় ঠিক জায়গায় পৌছনোটা বড় কঠিন ব্যাপার।”

“রাস্তায় জ্যাম ছিলো?” চম্বল বলে।

“না, তেমন কিছু না। সমস্যা সেটা না।”

কিন্তু সমস্যা কি, সেটা মহিমবাবু বললেন না। চুপ করে কি ভাবতে লেগে গেলেন। চম্বলও চুপ করে যায়। এদিকে গাড়িটা বাজারের ভিড় ঠেলে অপেক্ষাকৃত খালি রাস্তায় এসে পৌঁছেছে। চম্বল দোকানের সাইনবোর্ড থেকে দুএকটা রাস্তার নাম দেখে। একটা নাম পাঠিয়ে দেয় টিমো কে।

বেশ কিছুক্ষণ পর গাড়িটা একটা পাঁচিল ঘেরা দোতলা বাড়ির ভেতর ঢুকে গিয়ে দাঁড়ায়। চম্বল গাড়ি থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকায়, যদি কোনো ঠিকানা বা নাম দেখা যায়। কিন্তু সেরকম কিছু পায়না। একজন দারোয়ান রাস্তার দরজাটা বন্ধ করে দেয়।

“এদিকে আসুন,” মহিমরঞ্জন চম্বলকে ডেকে বাড়ির মধ্যে ঢোকেন। চম্বল ওনার সাথে একটা বড় বৈঠকখানা ঘরে এসে উপস্থিত হয়। সেখানে মুখোমুখি দুটি সোফায় দু’জন লোক বসে আছেন। একজনের পরণে ঘরোয়া পাঞ্জাবী পাজামা আর অপরজন পরে আছেন শার্ট প্যান্ট, পায়ে মোজা। বোঝা যায় উনি বাইরে থেকে এসেছেন দেখা করতে। দুজনেই আলোচনায় ব্যস্ত, সামনে দুটি চায়ের খালি পেয়ালা।

চম্বল ভাবে, দেখে তো ডাকাত ডাকাত লাগছে না। অবশ্য ডাকাতকে কিরকম দেখতে সেটা ও নিশ্চিত ভাবে জানে না।

মহিমরঞ্জন ঢুকতে পাঞ্জাবী পরা ভদ্রলোক মুখ তুলে তাকান। বলেন, “এসো, মহিম। পোশাকে যে পুরো উত্তমকুমার। সেভেনটিজ নাকি হে?”

মহিমরঞ্জন একটু লজ্জা মুখ করে হেসে বলেন, “হ্যাঁ, একটু কাজ ছিলো। এই যে, বৈদ্য’দা, আমাদের নতুন রিক্রুট চম্বল। চম্বল, ইনি ডক্টর বৈদ্য।”

চম্বল কি বলবে বুঝতে পারে না। শেষে ইতঃস্তত করে বলে, “গুড মর্নিং, স্যার।”

“গুড মর্নিং চম্বল। তুমি একটু পাশের ঘরে বসো। আমি তোমাকে ডেকে নেবো।”

চম্বল ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসে। মহিমরঞ্জন পাশের একটা ঘরের দরজা খুলে বলেন, “এখানে বসুন।”

ঘরটা একটা ওয়েটিং রুম, অনেকটা ডাক্তারখানায় যেরকম থাকে, সেরকম। চম্বল ঢুকে বসে। মহিমরঞ্জন কোথায় চলে যান। একটু পরে দুই মগ কফি নিয়ে হাজির হন। চম্বলকে একটা দিয়ে নিজে আরেকটা নিয়ে চম্বলের উল্টোদিকে বসেন। কফিতে চুমুক দিয়ে বলেন, “কি চম্বলবাবু, এখনো চিন্তিত? আমাদের দেখে এখনো ক্রিমিনাল মনে হচ্ছে?”

চম্বল বলে, “ক্রিমিনালদের কি অন্যরকম দেখতে হয়? আমার আপনার মতই দেখতে হয়। দেখে বোঝা যায়না।”

মহিমরঞ্জন খুশি হন। ঢকঢক করে মাথা নেড়ে বলেন, “একদম ঠিক কথা। এটাই শুনতে চাইছিলাম।” তারপর চোখ বন্ধ করে ঢুলতে থাকেন। থেকে থেকে কফিতে চুমুক দেন।

পাশের ঘরের মিটিং চলতে থাকে। চম্বল কথাবার্তা বুঝতে পারেনা, কিন্তু কথা ইংরাজীতে হচ্ছে সেটা বোঝে। একসময় ওর ও চোখ জরিয়ে আসে।

হঠাৎ পাশের ঘর থেকে হাঁক আসে, “মহিম, কোথায় গেলে? এসো।”

চম্বল উঠে দাঁড়ায়। বাইরের রাস্তায় একটা গাড়ির আওয়াজ শোনা যায়। সেই ভদ্রলোক বোধহয় চলে গেলেন।

মহিমরঞ্জন আড়মোড়া ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। বলেন, “চলুন তবে।”

 

 

ডক্টর বৈদ্য সোফায় হেলান দিয়ে বসে চম্বলকে বলেন, “মহিম তোমার লাঠি আর তরোয়াল খেলার প্রশংসা করছিলো। ভেরি গুড। আজকাল এসব কজন পারে? তোমার বাবা তোমায় শিখিয়েছেন শুনলাম। ভেরি নাইস। আমাদের তোমার মত একটু লড়াই জানা সাহসী ছেলে দরকার। তাইজন্যই তোমাকে বেছেছিলাম ঐ এজেন্সিটার থেকে। ওরা অবশ্য তোমাকে সিনেমার কথা বলেই পাঠিয়েছিল। কি আর করবে, আমরা ওদেরকেও বলতে পারিনা কাজটা কি। ভেরি কেয়ারফুল থাকতে হয়।”

“কাজটা কি?” অবশেষে চম্বল জিজ্ঞাসা করে।

“হ্যাঁ, এই যে এক্ষুনি জানতে পারবে। মহিম, ওই কাগজগুলো দাও না।” মহিমরঞ্জনের থেকে একতারা কাগজ নিয়ে চম্বলের সামনে টেবিলে নামিয়ে রাখেন ডক্টর বৈদ্য। “এইগুলো সই করে দাও, ব্যাস। তারপরেই বলছি।”

“এসব কি?”

“এই কাগজে সই করে তুমি প্রতিজ্ঞা করছো যে আমি তোমাকে যা বলবো তা তুমি বাইরের কাউকে জানাবে না।”

“তার মানে কি?” চম্বলের মোটেই ভালো লাগে না ব্যাপারটা। “কি এমন কাজ করেন আপনারা যে লোকে জানলে সর্বনাশ হয়ে যাবে?”

“কি কাজ করি সেটা জানতে গেলে আগে সইটা করতে হবে।” মহিমরঞ্জন পাশ থেকে বলেন।

চম্বল সোজা উঠে দাঁড়ায়। “রাখুন আপনার কাজ। রাখুন আপনার চাকরি। আর রাখুন আপনার কাগজ। আপনারা লোক সুবিধার নন। আমি চললাম।”

“আরে রেগে যাচ্ছ কেন?” ডক্টর বৈদ্য বলেন। “বোসো, বোসো। আমরা খারাপ লোক নই। আচ্ছা সই পরে করলেও চলবে। জল খাবে?”

চম্বল ভুরু কুঁচকে ডক্টর বৈদ্যর দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু বলছে না।

ডক্টর বৈদ্য বলেন, “আমরা হারিয়ে যাওয়া জিনিস উদ্ধার করি।”

“কিরকম জিনিস?”

“বিভিন্ন রকম। তবে সেগুলো হারিয়ে গেছে চিরতরে, আর পাওয়া যাবে না। সেরকম জিনিস।”

“মানে গুপ্তধন?”

“তাও হতে পারে।”

“ধুসস,” চম্বল ধপ করে সোফায় বসে পড়ে। “আপনারা প্রত্নবিদ, বুঝেছি। পুরোনো জিনিস উদ্ধার করেন। এমন করলেন যেন কিই না কি করছেন। সই-সাবুদ কত নাটক। কি ক্ষতি হবে লোকে জানতে পারলে?”

“তুমি আমার কথাটা মন দিয়ে শোনোনি,” ডক্টর বৈদ্য বলেন। “আমরা শুধু সেরকম জিনিস উদ্ধার করি, যা চিরতরে হারিয়ে গেছে, বা নষ্ট হয়ে গেছে। যা খুঁজলেও পাওয়া যাবে না।”

“সে আবার কি? নষ্ট হওয়া জিনিস আবার উদ্ধার হয় নাকি”?

“নষ্ট হয়ে যাওয়ার আগে উদ্ধার করতে হয়।”

“কি বলছেন, কোনো মানে হয় না।” চম্বলের মাথাটা এখনো ঠান্ডা হয়নি।

পাশ থেকে মহিমরঞ্জন ডক্টর বৈদ্যকে বলেন, “উদাহরণ দিয়ে বোঝান।”

“হ্যাঁ, উদাহরণ দিয়ে বোঝাই,” ডক্টর বৈদ্য মেনে নেন। তারপর মহিমরঞ্জনকে জিজ্ঞাসা করেন, “কিন্তু কোন উদাহরণটা দিই?”

“যেটা রিসেন্ট, সেটাই দিন না। ওই বাবরের কেসটা।”

ডক্টর বৈদ্য আবার চম্বলের দিকে ফেরেন। “ফর এক্সাম্পল, চম্বল, বাবরের একটা তলোয়ার একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে বা পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। সেটা উদ্ধার করা প্রয়োজন।”

“বাবর? মানে সম্রাট বাবর?” চম্বল অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে।

“হ্যাঁ, আকবরের দাদু।” ডক্টর বৈদ্য বলেন।

“ঠাকুরদা,” মহিমরঞ্জন শুধরে দেন।

“সরি, ঠাকুরদা। যে বাবর মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল, বুঝতে পেরেছো তো?” চম্বল মাথা নেড়ে সায় দেয়। ডক্টর বৈদ্য বলতে থাকেন, “এখন সেই বাবরের একটা মহামূল্যমান তরোয়াল গেছে খোয়া। বাবর সেটাকে অপয়া ভেবে পুঁতে দিয়েছিলেন আর তারপরেই সেটা চুরি হয়ে যায়। সেই রাত্তিরেই। ভেরি স্যাড।”

“কে চুরি করেছিল?” চম্বল জিজ্ঞাসা করে।

“কয়েকজন লোক মিলে চুরি করেছিলো, কিন্তু তাতে তারা লাভবান হয়নি। মধ্যিখানে তরোয়ালটা চিরতরে হারিয়ে গেলো। আমরা সেটা উদ্ধার করতে চাই। আমাদের টিম আছে এই কাজ করার জন্য, তোমার সাথে তাদের আলাপ করিয়ে দেবো। তোমাকে আমরা সেই টিমের আরেকজন মেম্বার হিসাবে রিক্রুট করেছি। উদ্ধারকার্যে তোমাকে যেতে হবে।”

“কোথায় যেতে হবে? তরোয়ালটা এখন কোথায় আছে?”

ডক্টর বৈদ্য বলেন, “তরোয়ালটা এখন আর কোথাও নেই। ওটা চুরি হয়ে যাওয়ার মুহূর্ত থেকেই হাতের নাগালের বাইরে চলে গেছে। তাইজন্য চুরি যাবার আগেই ওটাকে তুলে নিয়ে আসতে হবে।”

“চুরিটা হয়ে গেছে, না হবে?”

“হয়ে গেছে, সেই বাবরের আমলেই।”

চম্বল তাকিয়ে থাকে ডক্টর বৈদ্যর দিকে। লোকটা কি যালিয়াত না পাগল?

ডক্টর বৈদ্য যেন ওর মনের কথা বুঝেই হাসেন। তারপর বলেন, “ঐ যন্ত্রটা অনেকদিন আগেই আবিস্কার হয়ে গেছে, চম্বল। কিন্তু কেউ জানেনা। লুকিয়ে রাখা আছে পৃথিবীর কয়েকটা মাত্র জায়গায়। কারণ এই  যন্ত্র খারাপ লোকের হাতে পড়লে চরম সর্বনাশ।”

“কোন যন্ত্র?” চম্বল রোবটের মত প্রশ্ন করে।

“টাইম মেশিন, অবশ্যই।”

 

চম্বল এক গেলাস জল ঢক ঢক করে খেয়ে নেয়। রুমাল দিয়ে মুখ মোছে। “গরম দুধ খাবেন এক কাপ?” মহিমরঞ্জন জিজ্ঞাসা করেন। চম্বল মাথা নাড়ে।

 

“আপনার কাছে টাইম মেশিন আছে? বললেই আমি বিশ্বাস করবো?”

“বিশ্বাস করতে হবে না। নিজের চোখে দেখবে। তাতে করেই যাবে তরোয়াল আনতে।”

“কখন কোথায় যেতে হবে?”

“বিশে এপ্রিল, পনেরশো ছাব্বিশ। পানিপথের প্রথম যুদ্ধের আগের দিন সন্ধেয় মুঘল শিবিরে।”

“ও আচ্ছা।” চম্বল বহু ভেবেও আর কি বলবে বুঝতে পারে না। মাথাটা নিরেট ইঁটের মত লাগছে। বারুইপুরের বাগানবাড়িতে টাইম মেশিন?

“এবারে একটু কাগজগুলোয় সই করে দেবে?” ডক্টর বৈদ্য করুণ আবেদন জানান।

আর আপত্তি করেনা চম্বল। সই করার কাগজগুলো টেনে নেয়। একটু পড়ে বলে, “পাস্টফাইন্ডার লিমিটেড কি?”

“আমাদের এজেন্সীর নাম,” ডক্টর বৈদ্য বলেন। “পাস্টে গিয়ে জিনিস্পত্র ফাইন্ড করি তো। তাই নাম পাস্টফাইন্ডার। কেনো মহিম তোমাকে নাম বলেনি?”

“কিছুই বলেননি উনি,” চম্বল অভিযোগ জানায়।

“নাম বললেই আপনি গুগল করতেন,” মহিমরঞ্জন বলেন। “তারপর গুগলে কিছু পেতেন না আর আমাদের মিথ্যাবাদী ভাবতেন”।

“তা ঠিক, তা ঠিক,” ডক্টর বৈদ্য বলেন। “গুগল করে আমাদের পেতে না। আমরা একটু…ইয়ে…গোপন আর কি”।

চম্বল কাগজগুলোয় সই করে দেয়।

“চলো এবার নিচে যাওয়া যাক। বাকিদের সাথে আলাপ করিয়ে দিই তোমার।” ডক্টর বৈদ্য উঠে পড়েন। চম্বলকে সাথে নিয়ে ঘরটা থেকে প্যাসেজে বেরিয়ে আসেন। মহিমরঞ্জন ঘরেই থেকে যান। ডক্টর বৈদ্য একটা ঘরের দরজা খোলেন, আলো জ্বালেন। ঘরটা একটা রান্নাঘর। ডক্টর বৈদ্য ঢুকে যান, চম্বল বাইরে অপেক্ষা করে।

“কি হল? এসো।” ডক্টর বৈদ্য ডাকেন।

রান্নাঘরে ঢুকতে হবে? আচ্ছা, বেশ। চম্বল ঢুকে দাঁড়ায়। ডক্টর বৈদ্য দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে একটা সুইচ টেপেন। চম্বলের হঠাৎ মনে হয় তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে।

পুরো রান্নাঘরটা একটা লিফটের মত নিচে নেমে যাচ্ছে।

লিফট থামার পরে রান্নাঘরের দরজাটা খুলে দেন ডক্টর বৈদ্য।

বাইরে একটা করিডর। ঝাঁ চকচকে। যেমন দেখা যায় কোনো সুপার স্পেশালিটি হসপিটালে বা খুব বড় কোম্পানীর অফিসে।

“এসো, চম্বল। এইখানে আমাদের অপারেশান সেন্টার।”


Next chapter 

৩। অপারেশান সেন্টার

 করিডরটার দুদিকে সারি দরজা। শেষপ্রান্তে একটা দু’পাল্লার দরজা। বেশিরভাগ গুলোই বন্ধ। শেষের ডানদিকের দরজাটা খোলা, সেখান থেকে কিছু গলার আওয়াজ আসছে। ডক্টর বৈদ্য চম্বলকে সেই ঘরটাতে নিয়ে যান। ঘরটা অনেকটা অফিসের মিটিং রুম গোছের। মধ্যে একটা বড় লম্বা টেবিল, তাকে ঘিরে বেশ কিছু চেয়ার। একপ্রান্তে একটা বোর্ড।

ঘরের মধ্যে দুটি লোক এবং একটি মেয়ে বসে কথা বলছিলো। ডক্টর বৈদ্য ঘরে ঢুকে বলেন, “আলাপ করিয়ে দিই, আমাদের নতুন রিক্রুট চম্বল। কালকে তোমাদের যার কথা বলেছিলাম। এই মিশন থেকেই ও ফিল্ড এজেন্ট হয়ে কাজ করবে।”

ঘরের তিনজন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। ডক্টর বৈদ্য পরিচয় করিয়ে দেন।

“এই হল প্রত্যুষ, ফিল্ড লিডার।”

একটি পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছরের লম্বা পেটানো চেহারার ছেলে এগিয়ে এসে চম্বলের সাথে করমর্দন করে চম্বলের পিঠে হাত রাখে। বলে, “ওয়েলকাম, চম্বল।”

চম্বল ধন্যবাদ জানায়।

ডক্টর বৈদ্য বলেন, “এই হচ্ছে অহনা। ও আমাদের ফিল্ড রিসার্চার। আর পল্টন তোমার মতই ফিল্ড এজেন্ট।”

দুজনেই চম্বলের সাথে করমর্দন করে। অহনা বলে, “তোমার নিশ্চয়ই এখন মাথাটা বনবন করে ঘুরছে। চিন্তা নেই, সবারই প্রথমে ওরকম হয়। আমারও হয়েছিলো।”

পল্টন চম্বলের হাত ধরে বলে, “ব্রাদার, আমিও ফেন্সিং জানি। একবার হয়ে যাক?”

“পরে হবে,” ডক্টর বৈদ্য নিরস্ত করেন। “এখন বোসো। বোসো চম্বল।”

চম্বল বাকি সবার মত একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে।

ডক্টর বৈদ্য বলেন, “তোমরা কেস ব্রিফিং অলরেডি পেয়েছ, কিন্তু চম্বল এখনো জানে না। আমি ওর জন্য আবার সংক্ষেপে বলছি। চম্বল, পানিপথের প্রথম যুদ্ধ কার সাথে কার হয়েছিলো মনে আছে?”

একটা তো বাবর, সেটা এক্ষুনি জানা গেছে। আরেকটা কে? সেই কে একটা যেন পাগলা রাজা ছিল?

“বিন তুঘলক?” চম্বল চান্স নেয়।

“না, তিনি আরো আগের যুগের লোক। বাবর লড়েছিলেন ইব্রাহিম লোদির বিরুদ্ধে। যুদ্ধের ঠিক প্রাক্কালে একজন জ্যোতিষি বাবরকে বলেন, যে তাঁর প্রিয় তরোবারিটি অপয়া হয়ে গেছে। ওইটি থাকলে তিনি যুদ্ধে জিততে পারবেন না। বাবরের সৈন্যসংখা এমনিতেই লোদির থেকে অনেক কম ছিল। বাবর চিন্তায় পড়ে গেলেন। তখন সেই জ্যোতিষি আরো বললেন যে, ওই অপয়া তরোয়াল নিয়ে যুদ্ধে নামলে শুধু যে রণে ভঙ্গ দিতে হবে তাই নয়, তার সাথে বাবর তার পুত্র এবং সেনাপতি হুমায়ুনকেও চিরতরে হারাবেন। বাবর এতবড় ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। তিনি তার পরমপ্রিয় তরবারিটিকে শুধু যে পরিত্যাগ করলেন তাই নয়, তাকে সমাধিস্ত করলেন। কিন্তু গোপনে। এই কথা জানলো শুধু হাতে গোনা কয়েকজন। তার পরের দিন বাবর লোদির প্রায় পাঁচগুণ বড় সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে যুদ্ধে জিতলেন।”

“তলোয়ারের অশুভ শক্তি দূর হওয়ার দরুন?” চম্বল অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করে।

“না,” ডক্টর বৈদ্য বলেন। “বাবরের রণকৌশলের দরুন। যুদ্ধে জিতে বাবর সাম্রাজ্য প্রতিষ্টা করলেন। তারপরে কেটে গেল তিরিশ বছর। আবার পাণিপথে দুই সেনাবাহিনী মুখোমুখি। এবার কিন্তু অন্যলোক। মনে আছে চম্বল, পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ কারা লড়েছিল?”

এই রে, আবার?

“ব্রিটিশরা?” চম্বল আবার অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ে।

“ব্রিটিশ!” ডক্টর বৈদ্য আকাশ থেকে পড়েন। “তখন ব্রিটিশ কোথায়? সবে তো মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে। দ্বিতীয় যুদ্ধটি হয় আকবর এবং সম্রাট হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্য বা হেমুর মধ্যে।”

“এসব কি কারুর মনে থাকে স্যার?” চম্বল প্রতিবাদ করে। “আমি তো অ্যাাপ্লাই করেছিলাম সিনেমায় নামার জন্য।“

চম্বলের কথা যেন শুনতেই পাননি এমন ভাবে ডক্টর বৈদ্য বলতে থাকেন, “যুদ্ধটা আকবর এর নামে ঘটে, কিন্তু আকবর নিজে ছিলেন না। কারণ আকবরের বয়েস তখন তেরো। তাঁকে লড়াই করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পাঁচ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী আকবর কে সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব নেয়। তাদের কাছে নির্দেশ দেওয়া ছিল যে, মুঘল বাহিনী যদি হারতে শুরু করে তবে তারা তৎক্ষণাৎ আকবরকে নিয়ে কাবুলের পথে রওনা হয়ে যাবে। কাবুল মুঘলদের জায়গা, সেখানে হেমু পৌঁছতে পারবেন না। এই অব্দি ঠিক আছে?”

চম্বল মাথা নাড়ে।

“অহনা, তুমি তাহলে ওকে বাকিটা বলে দাও”। ডক্টর বৈদ্য বলেন। “আমি একটু দোভাষী বাবুর সাথে কথা বলে আসি।”

ডক্টর বৈদ্য উঠে গেলে অহনা বলতে শুরু করে। “যুদ্ধের আগের দিন কিশোর আকবর ভয়ানক গোঁ ধরে। সে যুদ্ধ করবেই, সে কিছুতেই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে বসে থাকবে না। অনেক বোঝানোর পর - এবং খানিকটা হালকা বকা-ধমকের পর আকবর একটু বাধ্য হন কিন্তু পরিস্কার জানান যে, তাকে যদি যুদ্ধ করতে না দেওয়া হয় তাহলে অন্তত তাকে তার ঠাকুরদার তরোয়ালটা এনে দিতে হবে মাটি খুঁড়ে। সে প্রচন্ড বায়না – জিনিসপত্তর ভাংচুর, চেচামিচি, কান্নাকাটি। শেষে আকবরের অভিভাবক বৈরাম খাঁ বাধ্য হয়ে মেনে নেন। একজন বিশ্বস্ত অনুচরের কাছে তরোয়ালটার সমাধিস্থলের নির্দেশিকা দিয়ে আকবরের বডিগার্ড বাহিনীকে দায়িত্ব দেন, আকবরকে যথাস্থানে নিয়ে গিয়ে তলোয়ারটি মাটি খুঁড়ে বার করে দিতে।

“কিন্তু সেইখানে পোঁছেই লাগল ধাক্কা। সমাধি ফাঁকা। তলোয়ার কেউ আগেই বার করে নিয়েছে।”

“চুরি হয়ে গেছে,” চম্বল বলে। “খুব স্বাভাবিক।”

“হ্যাঁ, কিন্তু তখন কেউ চুরির কথা ভাবলোনা। সবাই ধরেই নিল যে বাবর নিজেই যুদ্ধের পরে কখনো গোপনে কবর খুঁড়ে তার প্রিয় অস্ত্রটি বার করে নিয়েছিলেন এবং তারপরে কোথাও সরিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে লোকে তাঁর দুর্বলতার কথা জানতে না পারে। এই কয়েকদিন আগে অব্দি ঐতিহাসিকরাও সেটাই সত্যি বলে ভাবতেন। একদল লোক কাবুলে বাবরের সমাধি খুঁড়ে দেখার কথাও বলেছিলো। কেউ আবার বলতো, ওটা আসলে মুঘলদের কাছেই ছিলো, পরে ব্রিটিশরা চুরি করে নিয়েছিলো। আবার লোকে এমনও বলেছে যে, কিশোর আকবর নিজেই লুকিয়ে দিয়েছিলো। মোট কথা ওটা কোথাও লুকানো আছে।

“কিন্তু সেই ধারণাটা বদলে গেলো কয়েকদিন আগে একটা পুঁথি আবিস্কার হওয়ার পরে। সেই পুঁথিতে এক ব্যক্তি স্পষ্ট করে জানাচ্ছে যে সে নিজে হাতে আরো কয়েকজন সাকরেদ সহযোগে বাবরের তলোয়ার চুরি করেছিলো। সেই জ্যোতিষির সাথেও এদের ষড় ছিলো। কিন্তু লোকটা দুঃখ করছে এই বিষয়ে, যে তলোয়ারটা লুকিয়ে রাখা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেই অনেক লড়াই হয়েছে এবং শেষে তরোয়ালটি হারিয়েই গেছে। ইন্টারেস্টিং হচ্ছে তাদের চুরি করার সময়টাও। তাদের নিজেদেরও মনে হয়েছিলো যে যুদ্ধ জিতলে বাবর ওটা আবার উদ্ধার করে নেবেন। তাই তারা সেই সুজোগ না দিয়ে প্রথম যুদ্ধের আগের রাত্রেই – অর্থাৎ বাবর তলোয়ারটা সমাধিস্থ করার কিছুক্ষণ পরেই সেটি চুরি করে নেয়।”

“বাবরের ওপর কারুর ভরসা ছিলো না দেখছি,” পল্টন বলে ওঠে।

“যোদ্ধা রাজাদের কাছে তাদের ঘোড়া আর তলোয়ার তাদের প্রাণের থেকেও প্রিয় হত,” প্রত্যুষ পল্টন কে বলে।

অহনা বলে, “তাহলে দেখলে চম্বল, ব্যাপারটা পুরো বদলে গেলো। যে বস্তুটি বাবর বা আকবর লুকিয়েছিলেন অথবা ব্রিটিশরা নিয়ে গেছিল, সেই বস্তুটি খুঁজে পাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যে জিনিস আজ থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আগে চুরি গেছে এবং চোরেরাই হারিয়ে ফেলেছে বা হয়তো নষ্টই করে ফেলেছে, তাকে কি আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব?”

“তাহলে কি কর্তব্য?” চম্বল বলে। “তরোয়ালটা চুরি যাওয়ার আগেই নিয়ে আসতে হবে?”

“হ্যাঁ, কিন্তু বাবরের নাকের ডগা থেকে নিয়ে আসা সম্ভব নয়,” প্রত্যুষ বলে। “ধরা পড়লে ওই তলোয়ার দিয়েই গলা কেটে দেবে।”

“তাহলে?”

“তাহলে তলোয়ারটা সমাধি দেওয়ার পর থেকে চুরি যাওয়ার আগে অব্দি কোনো একটা সময় সেটাকে উদ্ধার করতে হবে। বলতে পারো, চোরেদের আগে চুরি করে আনতে হবে।”

চম্বল মাথা নাড়ে। রাত্তিরের অন্ধকারে মাটি খুঁড়ে তলোয়ার বার করাটা খুব অসম্ভব কাজ নয়। সবাই মিলে চেষ্টা করলে হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই সমাধিস্থলে কোনো পাহাড়াদার থাকবে না? এত প্রিয় তলোয়ার বাবর নিশ্চয়ই বন বাদাড়ে পুঁতে দিয়ে আসেননি।

“সমাধিস্থলটা কিরকম জায়গায়?” চম্বল জিজ্ঞাসা করে।

“নো আইডিয়া।” ডক্টর বৈদ্য কখন আবার ফিরে এসেছেন। সঙ্গে আরেকজন রোগা করে মোটা গোঁফওয়ালা লোক। লোকটি একটি চেয়ার টেনে বসে। ডক্টর বৈদ্য একটা চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে চেয়ারটার পিঠে হাত রেখে বলেন, “বাবর তলোয়ারটাকে কোথায় পুঁতেছিলেন, তা আমরা জানি না। ইতিহাসে এর কোনো উল্লেখ নেই। আর বাবর খুব সম্ভবত খুব লুকিয়ে কাজটা করেছিলেন।”

“কিন্তু আকবর তো জানতেন!” চম্বল বলে ওঠে। “তিনি কিছু বলে যাননি?”

“একদম ঠিক কথা চম্বল, কিন্তু দুঃখের বিষয় আকবরও কিছুই বলে যাননি। সেই কারণে এখন আমাদের কাছে একটাই রাস্তা খোলা আছে। ফলো করে দেখতে হবে তরোয়াল কোথায় পোঁতা হয়েছিলো।”

“বাবরকে ফলো করতে হবে?” চম্বল একটু চিন্তায় পরে যায়।

“না। বাবর রাত্তিরের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে কখন কোথায় পুঁতেছিলেন, সেটা বার করা শক্ত।” ডক্টর বৈদ্য বলেন। “তার থেকে অনেক সিম্পল হবে আকবরকে ফলো করা। আকবর গেছিলেন দিনের আলোয়, সঙ্গে পাঁচ হাজার সৈন্য নিয়ে। তোমরা অনেক দূর থেকেই জায়গাটা পরিস্কার বুঝতে পারবে। ভালো করে সঙ্গের একটা ম্যাপে নোট করে নেবে। তারপর তিরিশ বছর আগে বাবরের সময়ে গিয়ে ঠিক সেই জায়গাটা খুঁজে বার করে রাত্তিরবেলায় তলোয়ারটা উদ্ধার করে নিয়ে আসবে।”

“ব্যস। এটাই কাজ।” পল্টন একগাল হেসে বলে।

“টিমে কে কে থাকবে?” প্রত্যুষ ডক্টর বৈদ্যকে জিজ্ঞাসা করে।

“তুমি, পল্টন, চম্বল আর মিস্টার চেঙ্গিস।” রোগা মত ভদ্রলোকের দিকে ফেরেন ডক্টর বৈদ্য। “মিস্টার চেঙ্গিস, আমাদের নতুন টিম মেম্বারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই - চম্বল চ্যাটার্জী। চম্বল, ইনি মিস্টার চেঙ্গিস, ইনি দোভাষী হয়ে যাবেন।”

মিস্টার চেঙ্গিস নমস্কার করেন। চম্বল থাকতে পারে না। মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়, “আপনার নাম চেঙ্গিস?”

“আপনার নাম চম্বল?” মিস্টার চেঙ্গিস উলটে প্রশ্ন করেন।

“হ্যাঁ, কিন্তু তার একটা কারণ আছে। আমার...”

মিস্টার চেঙ্গিস ওকে থামিয়ে দেন। বলেন, “আমার নামেরও কারণ আছে।”

মুঘল সাম্রাজ্যের সাড়ে তিনশ’ বছরের শাসনে একাধিক ভাষা প্রাধান্য পেয়েছিলো, ডক্টর বৈদ্য জানান। ফার্সী মূল ভাষা হলেও একদম শুরুতে বাদশাহরা সেই ভাষায় কথা বলতেন না। বাবর-হুমায়ুনের কথ্য ভাষা ছিল মূলত চাগাতাই তুর্কী। এই ভাষা লোপ পেয়ে গেছে গত শতাব্দিতেই। আবার মুঘল সাম্রাজ্যের শেষের দিকের ভাষা ছিলো উর্দু, যা প্রকৃতপক্ষে ফার্সী থেকেই এসেছিলো। এছাড়া ধার্মিক কারণে আরবী ভাষার প্রচলন তো ছিলোই।

“মিস্টার চেঙ্গিস যে শুধু আরবী, উর্দু  এবং ফার্সীতে পারদর্শী, তাই নয়,” ডক্টর বৈদ্য চম্বলকে বলেন, “উনি চাগাতাই তুর্কি ভাষাও লিখতে ও বলতে পারেন। তাই মুঘল আমলে যেতে হলে উনি অপরিহার্য।”

প্রত্যুষ চেয়ারটা পিছিয়ে উঠে দাঁড়ায়। “টাইম টু গো।”

বাকিরাও উঠে দাঁড়ায়।

“কোথায় যেতে হবে?” চম্বল বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসা করে।

“আকবরকে ফলো করতে।”

“এক্ষুনি?” চম্বল ঘাবড়ে যায়।

প্রত্যুষ মুচকি হাসে। বলে, “তুমি তো চাকরিতে জয়েন করেই ফেলেছো। এবার কাজ শুরু।”

 

করিডরের শেষপ্রান্তের দু’পাল্লার দরজাটার ওপারে একটা বসার ঘর। কিছু সোফা রাখা। একদিকে একটা আলো জ্বলা মেশিনের ভেতরে কিছু চিপস আর স্ন্যাকসের প্যাকেট আর আরেকদিকে একটা কোল্ড ড্রিঙ্কস এর ফ্রিজ। এক কোনায় একটা কফি মেশিন।

দুদিকে দুটো দরজা, দেখে ভারি মনে হয়। ডানদিকের দরজাটার গায়ে সাদা ধাতব পাতের ওপরে বেগুণী রঙ দিয়ে লেখা টি-উইং। আর বাঁদিকের দরজাটার ওপরে একই ভাবে লেখা পি-উইং।

প্রত্যুষ বাঁদিকের দরজাটার দিকে এগিয়ে যায়।

চম্বল অহনা কে জিজ্ঞাসা করে, “পি আর টি মানে?”

“টি অর্থাৎ ট্রাভেল। ওদিকেই মেশিনটা আছে। আর পি মানে প্রিপারেশান। আমরা প্রথমে সেখানে যাচ্ছি।”

বাঁদিকের দরজাটা পেরিয়ে আরেকটা করিডর, তারও দুদিকে দরজা, তবে খোলা। অহনা চম্বলকে বলে, “এখানে স্টোর আছে, চেঞ্জিং রুম আছে। মেকআপ রুমও আছে। পুরোনো যুগে যেতে হলে সেযুগের পোশাকে সেযুগের মতো চেহারা বানিয়ে যেতে হয়।”

“তুমি যাও না কখনো?” চম্বল জানতে চায়। অহনার পোস্ট ফিল্ড রিসার্চার। ও কি তাহলে শুধু গবেষণা করে।

“হ্যাঁ, যাই তো। মিশনের ওপর ডিপেন্ড করে। সেযুগে মেয়েরা যুদ্ধ করতো না, যুদ্ধক্ষেত্রের আশেপাশে খুব একটা যেতও না। আমি তোমাদের সাথে গেলে সন্দেহজনক লাগতে পারে। তাই যাচ্ছি না।”

প্রত্যুষ একসেট পোশাক ধরিয়ে দেয় চম্বলকে। বলে, “চেঞ্জিং রুমে গিয়ে পড়ে নাও।”

চম্বল একটা পায়রার খোপের মতো চেঞ্জিং রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে। পোশাক বলতে একটা ছাই রঙের কামিজ আর একটা পাজামা। পরণের জামা প্যান্টটা ছেড়ে চম্বল কামিজ আর পাজামাটা পড়ে নেয়। কামিজের কোমড়ে একটা বন্ধনী ঝুলছিলো। সেটা দিয়ে কষে বেঁধে নেয় কামিজটাকে।

নিজেকে আয়নায় দেখে চম্বল। এত সাধারণ পোশাক সাধারণত পরা হয়না। কামিজের ধরণটাও অন্যরকম। চম্বলের মনে হয় যেন কোনো নাটকে কোনো নবাবের বাড়ির কর্মচারির পার্ট করতে চলেছে। চেঞ্জিং রুম থেকে বেরোনোর পর দেখে সামনে জুতো রাখা এক জোড়া। চামড়ার জুতো, পা গলানো। মোজার বালাই নেই। জুতোটা বেশ ফাটাফুটো, ব্যবহৃত। কিন্তু পায়ে মোটামুটি ফিট হয় চম্বলের।

“ঠিক আছে?” পল্টন জিজ্ঞাসা করে।

“হ্যাঁ, চলবে।”

পাশের ঘরে একটা টেবিলের ওপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে প্রত্যুষ একটা ম্যাপ দেখছিলো। অহনা একটা পেনসিল দিয়ে একটা জায়গা গোল করে ঘিরে দেয়। “এই অঞ্চলের মধ্যেই কোথাও একটা হবে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান অনুয়ায়ী আকবরের সৈন্য মুঘল শিবিরের পাশ দিয়ে উত্তর পূর্ব দিকে রওনা দিয়েছিলো। এই জায়গাটাই সবথেকে সম্ভাব্য।”

প্রত্যুষ ম্যাপটা ভাঁজ করে কামিজের পকেটে ঢোকায়। তারপর অহনার থেকে পেন্সিলটাও নেয়। অহনা একটা ইলাস্টিক লাগানো চশমা বাড়িয়ে ধরে। প্রত্যুষ সেটা চোখে গলিয়ে কিছু সেটিং পরীক্ষা করে নেয়। অহনা চম্বলকে বলে, “এটা একটা দূরবীন। সিম্পল, কিন্তু ফিল্ডের জন্য খুব স্যুটেবল।”

প্রত্যুষের কোমড়বন্ধনিটা আসলে একটা ব্যাগ, চম্বল লক্ষ্য করে। কিন্তু এক ঝলকে বোঝা সম্ভব না। প্রত্যুষ দূরবীনটা তার মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়। ভেতরে আরো কিছু জিনিস রাখা আছে মনে হয়।

টেবিলের ওপর চারটে লাঠি আর কয়েকটা ছোটো ছোড়া রাখা ছিলো। প্রত্যুষ সবাইকে একটা করে লাঠি দেয়। “পছন্দ মত একটা করে ছোড়া নিয়ে নাও।”

মিস্টার চেঙ্গিস ছাড়া সবাই একটা করে ছোড়া নিয়ে কোমরবন্ধনীতে গুঁজে নেয়।

“চলো এবার। গুড লাক।”

 

পি উইং থেকে বেরিয়ে সেই বসার ঘরটা পার হয়ে এবারে টি উইং। ভেতরে ঢুকেই সামনে এক সারি কম্পিউটার টেবিল। দুজন লোক সেখানে বসে কাজ করছে। প্রত্যুষ ওদের পাশ দিয়ে এগিয়ে যায় পেছনের একটা  ছোট কাচের জানলা বসানো দরজার দিকে। সেটার ওপর নক করতে একজন লোক কাচের অন্যদিক থেকে উকি মেরে দেখেন। তারপর দরজাটা খুলে দেন।

এখানে এতজন লোক কাজ করে সেটা ওপরে বসে বোঝাই অসম্ভব। চম্বল হাঁ করে এদিক ওদিক দেখতে থাকে।

ভেতরের ঘরটা একটা কনট্রোল রুম। একপাশে কালো কাচ, অন্যদিকে একটা ছোট অফিস, গায়ে লেখা কমিউনিকেশান সেন্টার। অহনা সেদিকে দেখিয়ে চম্বলকে বলে, “আমি ওখানে থাকবো, তোমাদের সাথে যোগাযোগ রাখবো। প্রত্যুষদার কাছে রিসিভার আর মাইক্রোফোন আছে। ও জানে কোন পরিস্থিতিতে কথা বলা সেফ।”

প্রত্যুষ, চম্বল, পল্টন আর মিস্টার চেংগিস কে লাইন দিয়ে দাঁড়াতে বলেন টেকনিশিয়ান ভদ্রলোক। তারপর প্রত্যেকের জামার মধ্যে একটা বেগুনী স্টিকার লাগিয়ে দেন। চম্বল হাত দিয়ে দেখে, রাংতাও নয়, প্লাস্টিক বা রবারও নয় আবার কাগজও নয়। এটা কি জিনিস?

প্রত্যুষ নিজে থেকেই বলে, “এই বস্তুটি একটি নতুন মেটিরিয়াল দিয়ে তৈরি। এমন একটা জিনিস যার সময়ের সাথে কোনো পরিবর্তন হয় না। আর এই যন্ত্রটা পুরো টিমকে একসাথে একজায়গায় এবং এক সময় নিয়ে যেতে ও ফিরিয়ে আনতে কাজে লাগে।”

টেকনিশিয়ান ভদ্রলোক টেবিলের ওপর থেকে একটা ফোন তুলে কাকে কিসব বলেন। আরো লোক আছে নাকি ভেতরে?

অবশেষে সেই কালো কাচের পেছনে আলো জ্বলে ওঠে। চম্বল দেখে কালো কাচের পেছনে একটা ঘর, তার দেওয়াল গুলো গাঢ় লাল কাপড়ে ঢাকা।

প্রত্যুষ টিমকে নিয়ে কাচের পাশের একটা দরজা দিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢোকে। ঘরের মাটিতে লাল কালি দিয়ে একটি বৃত্ত আকা। সবাই তার মধ্যে গিয়ে দাঁড়ায়।

“সিস্টেম রেডি,” কে যেন স্পিকারে জানান। “টাইম ক্যালিব্রেশান - সিক্সটি পার্সেন্ট। কমপ্লিট। স্পেস ক্যালিব্রেশান - নাইনটি পার্সেন্ট। কমপ্লিট।”

“আশা করি একদল সৈন্যর নাকের ডগায় গিয়ে ফেলবে না,” পল্টন বলে। প্রত্যুষ ফিক করে হাসে।

“স্পেস-টাইম - ক্যালিব্রেটেড। সিস্টেম প্রাইমড ফর ভয়েজ। ওয়েটিং ফর টিমলিড’স সিগনাল।”

প্রত্যুষ হাত তুলে থাম্বস আপ দেখায়।

সুইই...শ!

সব অন্ধকার। কুচকুচে কালো। তার সাথে পেছনে ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস করে আওয়াজ। যেন খুব পুরোনো কোনো গাড়ি পাহাড়ের রাস্তা দিয়ে জোরে ওঠার চেষ্টা করছে।

তারপরের হঠাৎ সব সাদা। একেবারে সাদা। পেছনে একটা ধুকধুক ধুকধুক করে আওয়াজ। অনেকটা বিয়েবাড়ির ডিজেল জেনারেটারের মতো।

চম্বল নিজের হাত পা দেখতে পায় না। পাশের কাউকেও দেখা যাচ্ছে না। শুধুই সাদা।

কিন্তু সাদাটা আস্তে আস্তে সবুজ হয়ে যাচ্ছে। আর খানিকটা খয়েরি আর কালো। রঙ গুলো আস্তে আস্তে জমাট বাঁধতে থাকে। পেছনের আওয়াজটাও বন্ধ হয়ে গেছে।

একটা পাখির কর্কশ চিৎকারে চমকে ওঠে চম্বল। কিন্তু সেটা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। রঙগুলোও আবার অস্পষ্ট হতে থাকে। সবুজ গুলে যাচ্ছে সাদার মধ্যে। ফের সেই ধুকধুক আওয়াজ, যেন জেনারেটার আবার চালু হলো। রুঙ আবার স্পষ্ট হয়।

এবারে সবুজ ও খয়েরির অনেক প্রকারভেদ দেখা যাচ্ছে। নিচে আর ওপরে মূলত সবুজ, আর চারপাশে বেশি খয়েরি ও কালো। চম্বল বুঝতে পারে তার চারপাশে গাছের অবয়ব। দেখে যে ওর হাত পাও স্পষ্ট হচ্ছে।

তারপরে পরিস্কার সুরেলা পাখির ডাক। গাছের পাতায় হাওয়ার আওয়াজ।

আওয়াজটা বন্ধ হয়ে যায়। আর জেনারেটারের প্রয়োজন নেই। চম্বলের সামনে গাছ, পেছনে গাছ। পায়ের তলায় ঘাস, আগাছা। মাথার ওপরে গাছের ফাঁক দিয়ে নীল আকাশ।

যাত্রা সম্পূর্ণ হয়েছে।


Next chapter 

৪। মোগলাই

 পানিপথ, চৌঠা নভেম্বর, পনেরোশ ছাপ্পান্ন। পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধের আগের দিন সকাল।

“এসে গেছি।” প্রত্যুষের গলা পাওয়া যায় পাশ থেকে। “সবাই ঠিক আছো?”

চম্বল ঘাড় নাড়ে। হ্যাঁ, ও ঠিক আছে।

হাতে দু’ঘন্টা সময় থাকবে, অহনা বলেছিলো। দু’ঘন্টার পরে নিজে থেকেই বর্তমান যুগে ফিরে আসতে হবে। তবে টিম লিডার চাইলে তার আগেই সবাইকে ফেরত আনানোর ব্যাবস্থা করতে পারে।

প্রত্যুষ পকেট থেকে একটা কম্পাস জাতীয় যন্ত্র বার করে দেখে। একদিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলে, “ঐদিকটা উত্তর-পূর্ব। পল্টন, তুই ওই লম্বা গাছটায় ওঠ। ওপর থেকে দেখ কিছু দেখা যায় কিনা।”

“ছোড়াটা ধরো,” পল্টন চম্বলের হাতে ওর ছোড়াটা দেয়। তারপর তরতর করে বড় গাছটায় চড়তে থাকে। চম্বল আর প্রত্যুষ ঘাড় উঁচু করে দেখে। মিস্টার চেঙ্গিস একটা পাথরের ওপর বসেন। শিঘ্রই পল্টন পাতার আড়ালে ঢেকে যায়।

প্রত্যুষ একটা ছোট যন্ত্র বার করে কানে লাগায়। বলে, “অহনা, টিম অন ফিল্ড।” কয়েক মুহূর্ত শুনে ‘অল ওকে’ জানিয়ে যন্ত্রটা আবার রেখে দেয় পকেটে।

পল্টন গাছ থেকে নেমে আসে একটু পরেই। মুখচোখে উত্তেজনা। বলে, “যুদ্ধক্ষেত্রটা অন্যদিকে। কিন্তু সামনেই একটা সেনা ছাউনি আছে। আর তার ওপারে একটা বাহিনী কোথাও যাচ্ছে, প্রত্যুষদা। অনেক সৈন্য। অভিমুখ মনে হল উত্তর-পূর্ব।”

“ঐটাই আকবরের সুরক্ষা বাহিনী,” প্রত্যুষ বলে। “আমি বলেছিলাম আরেকটু আগে পাঠাতে। কিন্তু সেই লেট করেছে। এখন আমাদের ছুটতে হবে, নাহলে ওদের ধরতে পারবো না। ওরা কত দূরে, পল্টন?”

“বেশ খানিকটা এগিয়ে আছে, মাঠটার অন্য প্রান্তে।”

“এই সেনা ছাউনিটা এড়িয়ে যাওয়া যায়না?”

“ছাউনিটা লম্বায় বেশি, চওড়ায় কম। ঘুরে যেতে হলে অনেকটা সময় লাগবে। কিন্তু যদি সোজা ওর মধ্যে দিয়ে পেরিয়ে যাই, তাহলে তারাতারি হবে।”

প্রত্যুষের কপালে ভাঁজ পরে। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে বলে, “ঠিক আছে, তাছাড়া উপায় নেই। আমরা ডায়মন্ড ফর্মেশানে যাবো। সামনে আমি, আমার পেছনে মিস্টার চেঙ্গিস আর চম্বল। শেষে পল্টন। কথা শুধু মিস্টার চেঙ্গিস বলবেন। চম্বল বোবা সাজবে আর পল্টন আসছে দক্ষিণ ভারত থেকে, তাই মুঘল বা আঞ্চলিক ভাষা কোনোটাই জানে না। চলো।”

জঙ্গলটা খুব ঘন নয়। একটু এগিয়ে আরো পাতলা হয়ে আসে। দূর থেকে অনেক রকম শব্দ শুনতে পায় চম্বল। ছাউনিটা কাছেই বোধহয়।

একসময় হঠাৎ শেষ হয়ে যায় জঙ্গলটা। সামনেই সারি সারি তাঁবু। দেখে মনে হয় এটা পেছনের দিক। প্রত্যুষ এগিয়ে চলে। তার পিছনে চম্বল আর চম্বলের ডানদিকে মিস্টার চেঙ্গিস।

দুটো তাঁবুর মধ্যে একটু ফাঁক দেখে সেদিকে এগোয় প্রত্যুষ। চম্বল এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে। কয়েকটা ছাগল বাঁধা আছে এক জায়গায়। তাঁবু গুলোর কাপড় বেশ মোটা, ধুসর রঙের। ওপরটা ছুঁচোলো।

দুটো লোক বেরিয়ে এসেছে একটা তাঁবু থেকে। একজন লোক বেশ ফর্সা, টিকোলো নাক, কালো ঢেউ খেলানো চুল। বাকিজনের রঙ তামাটে, যেন রদ্দুরে পোড়া, ছোট ছোট চোখ। দুজনের পরনে একই রকমের কামিজ, গোলাপী রঙের। একজনের হাতে একটা কাপড়ের বান্ডিল। লোকদুটো তাকিয়ে দেখলো, কিন্তু কিছু বললো না।।

এরা কি সত্যিই মধ্যযুগের মানুষ?

চম্বল ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। তামাটে লোকটা দাঁড়িয়ে ওদের দেখছে।

কিন্তু প্রত্যুষ এগিয়ে চলছে, চম্বল তারাতারি পা মেলায়। দূরে ছাগল ডাকছে।

তাঁবু গুলোর ফাঁক দিয়ে ওরা বেরিয়ে আসে একটা চওড়া রাস্তায়, দু’সারি তাঁবুর মধ্যের একটা পায়ে চলা পথ। এখানে বেশ কিছু লোক। কেউ দাঁড়িয়ে গল্প করছে। একজন লোক লাঠি খেলা দেখাচ্ছে, তাকে ঘিরে কয়েকজন দাঁড়িয়ে।

চম্বলের পাশেই একটা লোক বেরিয়ে আসে তাঁবু থেকে। চেঁচিয়ে কাকে যেন ডাকে। লোকটার সরু গোঁফ আর ছোট ছোট চুল।

প্রত্যুষ এগোতে থাকছে, চম্বল দাঁড়ায় না। পাশে মিস্টার চেঙ্গিস চুপচাপ হেঁটে চলেছেন, পেছনে পল্টন ও তাই।

দ্বিতীয় সারির তাঁবু পেরিয়ে আবার খানিকটা খোলা জায়গা। দুটো পালোয়ান লোক মুগুড় জাতীয় কিছু একটা নিয়ে লড়াই করছে। দর্শকদের মধ্যে একজন একটা ঢাল ছুঁড়ে দেয় দুজনের দিকে। এবার দুজনেই লড়াই করতে করতে সেই ঢালটা তোলার চেষ্টা করছে।

কিসের পোড়া গন্ধ নাকে আসে চম্বলের। পাশেই আগুন জ্বলছে, তার ওপর গাছের ডাল দিয়ে মাচা বানিয়ে কি যেন ঝলসে রান্না হচ্ছে। ছাগল বলেই মনে হয় চম্বলের।

চিঁহিইইইই...।

চমকে লাফিয়ে ওঠে চম্বল।

একটা ঘোড়া প্রায় গায়ে উঠে পড়েছিলো। পল্টন চম্বলকে ঠিক সময়ে টেনে সরিয়ে না নিলে চম্বল পড়েই যেত। ঘোরসওয়ার চম্বলের দিকে তাকিয়ে জোরে হেসে ওঠে। লোকটার পরণে একটা পাজামা আর উর্ধাঙ্গে শুধুই একটা চামড়ার বর্ম। মুখে একগাল চাপদাড়ি।

আরো এগিয়ে চলে প্রত্যুষ। এক জায়গায় কয়েকটা মুরগি চম্বলের পাশ দিয়ে চলে যায়। দুটো লোক সেগুলোকে তাড়া করেছে।

কে যেন গান করছে, কারা হাততালি দিচ্ছে।

অনেকগুলো বর্ম একজায়গায় জড়ো করে রেখেছে কারা। একজন লোক সেদিকে আঙুল দেখিয়ে দুটো ছোটো ছেলেকে বকছে।

যেখানে সেখানে ঘোড়া, ছাগল, মুরগি, হাঁস। যেখানে জঞ্জাল জমা হয়েছে সেখানে শুয়োরের পাল ঘুরছে। জঞ্জালের রঙ কেমন ধুসর বাদামী। কোন রঙ্গিন প্লাস্টিক, প্যাকিং বাক্স, উজ্জ্বল রঙের ছেঁড়া জামা - কিচ্ছু নেই। কোনো কোক পেপসির বোতল নেই।

এক জায়গায় অনেক মুরগির পালক। পাশে বসে একটা লোক একটা শালপাতায় কি খাচ্ছে। তার কপাল থেকে ঠোঁটের কোনা অব্দি একটা কাটা দাগ।

কত রকমের লোক চারিদিকে! কারুর চোখ ছোট, কারুর চোখে কাজল পড়া, কারুর লম্বা দাড়ি, কারুর দাড়ি গোঁফ কামানো, কারুর আবার সরু পেন্সিলের মত ছুঁচলো গোঁফ। অনেককেই দেখতে মঙ্গোলদের মত, কিন্তু সবাইকে নয়। বেশ অনেকের চেহারা মধ্যপ্রাচ্যের লোকেদের মত। যেন ইরান বা আরবদেশ থেকে এসেছে।

কারুর মাথায় বিশাল পাগড়ি, তবে ঠিক সর্দারজিদের মত নয়।

আর কত রকমের অস্ত্র। কত রকমের তরোয়াল, ঢাল, লাঠি, মুগুর, গদা, বর্শা, বল্লম আরো নাম না জানা কত কি! ওই যে একদল তিরন্দাজ অনুশিলন করছে। একটা লোক একটা সুন্দর সুসজ্জিত ঘোড়ার ওপর বসে তাদের এলেম পরীক্ষা করছে।

চম্বল নিজেকে চিমটি কাটে। ও কি সত্যিই অতিতে এসে পড়েছে নাকি সবটাই স্বপল? এই তো সকালেই বারুইপুর স্টেশানের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো। আর এখন সে কোথায়, কবে! আর ওর সামনে - এ কি সত্যিই্ল?আকবরের সৈন্যদল? এইরকম ছিলো তাহলে মুঘল সেনা!

“ঘোড়া দরকার,” প্রত্যুষ বলে ওঠে। “নাহলে পৌঁছতে পারব না।”

“ঘোড়া কোথায় পাবে?” পল্টন পেছন থেকে বলে।

চম্বলের মনে হয় যেন বাংলা ভাষাটাই এখানে বেমানান।

প্রত্যুষ বলে, “ধার নেবো। মিস্টার চেঙ্গিস, আপনি কোনো একটা আস্তাবলের লোককে বোঝাতে পারবেন, যে আমরা বিশেষ প্রয়োজনে আকবরের কাছে বার্তা পৌঁছোতে এসেছি? দুটো ঘোড়া ধার চাই আধঘন্টার জন্য?”

“চেষ্টা করে দেখতে পারি। যদি জিজ্ঞাসা করে কোথা থেকে আসছেন?”

“আমি ফিল্ড রিসার্চারের সাথে কথা বলে জানাচ্ছি।”

প্রত্যুষ ঝোলা থেকে কানে লাগানোর যন্ত্রটা বার করে। তারপর মিস্টার চেঙ্গিসের সাথে জায়গা বদল করে। এখন ওর ডানদিকে চম্বল। ডানদিকের কানে যন্ত্রটা লাগায় প্রত্যুষ। চম্বল বুঝতে পারে, এই যন্ত্রটা এখানের লোকেদের দেখতে দেওয়া যাবে না। ও আরেকটু  ঘেঁষে আস প্রত্যুষের দিকে।

প্রত্যুষ অলরেডি কথা বলতে শুরু করেছে। “ফিল্ড টু কমিউনিকেশান। অহনা, শুনতে পাচ্ছিস?”

“সাবধান, হাতি,” পল্টন পেছন থেকে বলে ওঠে।

পাশেই দুটো কাঠের গাদা, আর তার মাঝে একটা হাতি। তবে বাচ্চা। চম্বল ভয় পায় না, বরং ইচ্ছা হয় ওর শুঁড়ে একবার হাত বুলিয়ে দিতে। কিন্তু হাতির পেছনে একটা লোক এসে পড়েছে, মাহুত হবে নিশ্চয়ই। সেই লোকটা কম করে সাড়ে ছ’ফুট লম্বা। মাথা চকচকে নেড়া, পরে আছে শুধু একটা চামড়ার পাজামা এবং তার কোমড়ে একটা এক হাত লম্বা ছোড়া। লোকটার হাতে একটা চাবুক। কুতকুতে চোখ নিয়ে লোকটা ভুরু কুঁচকে ওদের দিকে তাকাচ্ছে। চম্বল আর কোনো চেষ্টা করে না হাতিকে আদর করার। ওই লোক যদি তারপর উলটে আদর করতে আসে...

প্র্ত্যুষ কথা শেষ করে মিস্টার চেঙ্গিসকে বলে, “আপনি বলবেন আমরা বাংলার লোক, এখন আসছি তুঘলকাবাদ হয়ে। আকবরের প্রতিপক্ষ হেমু ও বাংলায় থাকতেন আর কয়েকদিন আগেই তুঘলকাবাদ দখল করেছেন। সুতরাং এইসব জায়গার নাম নিলে ব্যাপারটা সিরিয়াস শোনাবে। একটু এরকম ভাব দেখাবেন যে, আমাদের যদি ঘোড়া না দেয় তাহলে পরে সোজা আকবরের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।””

আস্তাবল খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। একটু দূরে দূরেই এক এক জায়গায় কয়েকটা করে ঘোড়া বাঁধা আছে, তবে লোকও আছে সঙ্গে। কেউ খাওয়াচ্ছে, কেউ পরিস্কার করাচ্ছে, কেউ তত্ত্বাবধান করছে।

সেইরকম একটা আস্তাবলের সামনে দাঁড়ায় ওরা। চারটে ঘোড়া বাঁধা আছে, আর দুটো লোক একটা উল্টোনো কাঠের বাক্সের ওপর বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। একজনের কালো কামিজের ওপর হলুদ রঙ দিয়ে নকশা করা। বাকিজনের পোশাকে এত শুকনো কাদা যে কোথায় কি রঙ বোঝা মুশকিল। তবে তার পায়ের কাছে একটা লাঠি রাখা, যার রঙ টুকটুকে লাল।

মিস্টার চেঙ্গিস এগিয়ে যান কথা বলতে। ওরা তিনজন একটু দূরত্ব রেখে দাঁড়ায়। এই ভাষা তিনজনের কেউ বোঝে না সেটা না দেখালেই ভালো।

“কি চম্বল, কিরকম লাগছে?” প্রত্যুষ বলে।।

“জেগে আছি না স্বপ্ন দেখছি বুঝতে পারছি না,” চম্বল বলে। “এরা সত্যিই মুঘল সেনা?”

“একেবারে হানড্রেড পারসেন্ট মুঘল সেনা। এটা মাত্র একটা ছাউনি, এরকম আরো অনেকগুলো আছে।””

“আর এদের প্রতিপক্ষ?”

“হেমুর বাহিনী? তারাও আছে অন্য কোনো দিকে, ফাঁকা যায়গায় গেলে দেখা যাবে।”

“যুদ্ধ কবে হবে?” পল্টন জিজ্ঞাসা করে।

“কাল সকালে,” প্রত্যুষ বলে। “কাল বিকেলের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।”

“কারা জিতবে?”

“এরাই জিতবে। দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে মুঘলরাই জিতেছিলো।”

মিস্টার চেঙ্গিস কথা সেরে ফিরে এসেছেন। বলেন, “ওরা ঘোড়া দিতে রাজি আছে, বিশ্বাস করেছে আমরা দূত, কিন্তু বুঝতে পারছে না আমরা ঘোড়াটা ফেরত দেবো কিনা। বলছে কাউকে একটা এখানে বসে থাকতে হবে, যতক্ষণ না ঘোড়া ফেরত আসে।”

“পণবন্দি রাখতে চায়?” প্রত্যুষ বলে।

“হ্যাঁ। অনেক বোঝাবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু মানলো না। খালি বলছে ঘোড়া চুরি গেলে পয়সা কে দেবে।”

“আমি থাকছি,” পল্টন বলে। “তোমরা ঘুরে এসো।”

আর উপায় নেই দেখে প্রত্যুষ রাজি হয়ে যায়। বলে, “তুই একা না, মিস্টার চেঙ্গিসও থেকে যান। আমরা দু’জন যাই। চম্বলের ঘোড়ায় চড়ার শিক্ষাটা আজ কাজে আসুক।”

যে লোকটার গায়ে অনেক কাদা, সে উঠে একটা বাদামী রঙের ঘোড়া নিয়ে আসে ওদের সামনে। চম্বল গায়ে হাত বুলিয়ে দেখে। অত্যন্ত স্বাস্থবান ঘোড়া। গা চকচকে।

এক লাফে উঠে পড়ে চম্বল। ঘোড়াটা একবার নাক দিয়ে আওয়াজ করে চুপ হয়ে যায়। প্রত্যুষ লাফিয়ে ওর পেছনে উঠে বসে। বলে, “চল। সোজা গিয়ে মাঠে পড়ে বাঁদিকে এগো।”

তুমি থেকে তুই-তে চলে এসেছে প্রত্যুষ। চম্বল খুশিই হয়। ঘোড়াটার পেটে চাপ দিয়ে চলতে শুরু করে।

একটু সোজা যাওয়ার পরেই ছাউনিটা শেষ হয়ে যায়। খোলা মাঠের মধ্যে দিয়ে এগোয় চম্বল।

“একটু তারাতারি চল।”

চম্বল গতি বাড়ায়। ঘোড়াটা অত্যন্ত দক্ষ। হবে নাই বা কেন? সারা জীবনই ও সওয়ারি পিঠে নিয়ে মাঠে বনে দৌড়েছে।

ঝোপঝাড় বা ছোটখাটো নালা অনায়াসেই লাফিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে ঘোড়াটা। চম্বলের নিজেকেই মুঘল যোদ্ধা মনে হতে থাকে। এই সময়ে হাতে একটা খোলা তলোয়ার থাকলে...

“কোথায় যাচ্ছিস? আকবর বাঁদিকে।” প্রত্যুষ কানের পেছন থেকে বলে।

বাঁদিকে আকবর? চম্বল থতমত খেয়ে ঘোড়ার মুখ ঘোরায়।

বাঁদিকে কিছু গাছের ওপাড়ে একটা মাঠ, আর তার অন্যদিকে অনেক সৈন্য সামন্ত। তাদের সামনে একটা হাতি, ওপরে ছাতা।

কিন্তু কেউ নড়ছে না। পুরো সৈন্যবাহিনী দাঁড়িয়ে।

“দাঁড় করা, চম্বল। আমি একটা গাছে উঠে দেখি। মনে হচ্ছে বাহিনী সমাধিস্থলে পৌঁছে গেছে।”

চম্বল ঘোড়াটাকে একটা লম্বা গাছের খুব কাছে নিয়ে যায়। ঘোড়াটাও অমনি গাছ ঘেঁষে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। প্রত্যুষ ঘোড়ার ওপর থেকেই গাছের একটা ডাল পাকড়ে নিয়ে লাফ দিয়ে গাছে উঠতে থাকে।

চম্বল ঘোড়াটার পিঠেই বসে আছে। ওর একদিকে গাছের ফাঁক দিয়ে মাঠ দেখা যাচ্ছে, অপরদিকে একটা পুকুর। পুকুরের ওপাশে হালকা জঙ্গল। জঙ্গলের একটা গাছে একটা ঘোড়া বাঁধা আছে, চম্বলের চোখে পড়ে। কিন্তু কেউ নেই।

প্রত্যুষ ওপরের একটা ডালে পা ঝুলিয়ে বসেছে।

পুকুরের ওপাড়ে কি যেন নড়ছে। আরেকটা ঘোড়া বেরিয়ে আসছে গাছগুলোর পেছন থেকে। ঘোড়ার ওপরে একজন বসে আছে। তার মাথায় একটা ছূঁচোলো শিরস্ত্রান। লোকটা চম্বলের দিকে তাকিয়ে আছে।

চম্বল ওপরে তাকায়। প্রত্যুষ চোখে দূরবীন লাগিয়ে বসেছে। ওপর থেকে নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছে কি ঘটছে।

একটা চাপা শিষের শব্দ। চম্বল পুকুরের দিকে তাকায়। ঘোড়ায় বসা লোকটা শিষ দিয়েছে। কাউকে ডাকছে?

হ্যাঁ। ওটা ডাকই। আরেকটা লোক বেরিয়ে এসেছে গাছের পেছন থেকে। ঘোড়ার ওপরের লোকটা তাকে কি যেন বলছে।

চম্বল আবার ওপরে দেখে। প্রত্যুষ ঝোলার মধ্যে কি যেন খুঁজছে। তারপর একটা কাগজ বার করে। ম্যাপ বোধহয়। আবার দূরবীন চোখে তুলেছে এবারে।

ওদিকে দ্বিতীয় লোকটাও এবারে বাকি ঘোড়াটার ওপরে উঠে বসেছে। এরও মাথায় একটা শিরস্ত্রান, তবে অতটা ছুঁচলো নয়। লোকদুটো পাশাপাশি ঘোড়ার ওপর বসে আছে। ঘোড়া দুটো মাথা নিচু করে ঘাস খাচ্ছে।

একটা লোকের কোমড়ে একটা বড় বাঁকা তলোয়ারের মত কিছু।

লোকদুটো চলতে শুরু করেছে। কিন্তু আবার দাঁড়িয়ে গেছে। কারণ দ্বিতীয় লোকটা ওর ঘোড়ার দড়িটা খুলতে ভুলে গেছিলো। সে লাফিয়ে নেমে দড়ি খুলছে। বাকি লোকটা চম্বলকে দেখছে।।

খচরমচর আওয়াজ আসে চম্বলের ওপর থেকে, শুকনো পাতা পড়তে থাকে একগাদা। তারপর প্রত্যুষ নেমে আসে। সব থেকে নিচু ডালটা থেকে ঝাঁপ দিয়ে মাটিতে পড়ে।

প্রত্যুষ উঠে দাঁড়ানোর আগেই ঘোড়া ঘুরিয়ে নিয়েছে চম্বল। শব্দব্যয় না করে হাত বাড়ায় প্রত্যুষের দিকে। প্রত্যুষ বোঝে কিছু একটা হয়েছে। কোনো প্রশ্ন না করে লাফ মেরে উঠে আসে চম্বলের পিছনে।

পুকুরের ওপাড়ে দ্বিতীয় ঘোড়াটার দড়ি খুলে ঘোড়ার ওপর উঠে বসেছে লোকটা। চম্বল আর না দাঁড়িয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। এবং সঙ্গে সঙ্গে লোকদুটোও ঘোড়া ছোটাতে শুরু করে।

“ধরে বোসো,” চম্বল প্রত্যুষকে বলে। যদিও বলার দরকার ছিলো না। প্রত্যুষ লোকদুটোকে দেখতে পেয়েছে।

জোর ছুটছে ঘোড়াটা, রাস্তাটাও পায়ে চলে চলে বেশ শক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এই রাস্তা খুব বেশিক্ষণ নয়। একটু পরেই খানা খন্দ ঝোপ ঝাড় শুরু হয়ে যায়। পেছনে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনতে পায় চম্বল। ওরা তারাতারি এগিয়ে আসছে।

এরা কি ডাকাত না মুঘলদের শত্রুপক্ষ? যেই হোক, এদের উদ্দেশ্য ভালো ঠেকছে না।

পথ বদলায় চম্বল। প্রকাশ্যে ডাকাতির সম্ভাবনা কম। গাছগুলোর মধ্যে ফাঁক খুঁজে সুযোগ বুঝে ঘোড়াটাকে নিয়ে রাস্তাটার থেকে বেরিয়ে আসে। এবার খোলা মাঠ। ডানদিকে দূরে আকবরের সৈন্য আর বাঁদিকে খানিকটা দূরে ছাউনি। চম্বল ছাউনির দিকে মুখ ঘোরায়। দূরে তাঁবুগুলোকে যেন একটা ধূসর দেওয়ালের মত দেখাচ্ছে।

লোকদুটোও বেরিয়ে এসেছে মাঠের মধ্যে, ওদের একটু পেছনেই এখন।

আর পেছন দিকে না তাকিয়ে ঘোড়ার পেটে চাপ দেয় চম্বল। চল, যত জোরে পারিস। আওয়াজ শুনে বুঝতে পারে যে প্রত্যুষ তার খাপ থেকে ছোড়াটা বার করে নিয়েছে।

কিন্তু লোকগুলো পিছিয়ে পড়ছে। ভরসা পায় চম্বল। দু’হাত দিযে লাগাম কষে ধরে, গতি কমায় না। আস্তে আস্তে কাছে আসছে ছাউনিটা।

“ওরা আক্রমন করবে না মনে হয়,” প্রত্যুষ বলে। “মনে হচ্ছে ফলো করছে।”

চম্বল ঘুরে দেখে। লোক দুটো একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে গতি মিলিয়ে এগোচ্ছে। তাড়া করার মত লাগছে না আর। চম্বল ঘোড়ার গতি সামান্য কমায়।

আস্তাবল অব্দি লোকদুটো পেছনে আসে, তারপর কোথায় যেন মিলিয়ে যায়। প্রত্যুষ বলে, “ওরা আমাদের ঘোড়া চোর ভেবেছিলো। হয়তো ওরা এই শিবিরেরই সৈন্য। যখন দেখলো ঘোড়া ফেরত দিচ্ছি, তখন চলে গেলো।”

তাই হলেই ভালো, চম্বল ভাবে। “প্রথমে যেভাবে পিছু নিয়েছিলো, মনে হচ্ছিলো ধরতে পারলেই ঘচাং।”

“সেটা হতেও পারতো। এই যুগে লোকে শুধু সন্দেহবশত অনেক ঘচাং করেছে।” প্রত্যুষ বলে। “তুই জোরে ছুটিয়ে ঠিক করেছিস।”

আস্তাবলে পৌঁছে দেখা যায়  পল্টন আর পরিস্কার কামিজ পড়া লোকটা মাটিতে ঘর কেটে কয়েকটা পাথরকে ঘুঁটি বানিয়ে কিসব খেলছে। বাকি লোকটা আর মিস্টার চেঙ্গিস মন দিয়ে দেখছেন।

“তুই আবার লেগে পড়েছিস!” প্রত্যুষ পল্টনকে বলে। “চল এবার, ফিরতে হবে। কাজ হয়ে গেছে।”

চম্বল ঘোড়ার রাশটা একজনের হাতে দিয়ে দেয়। তারপর ঘোড়াটার পিঠে একটা চাপড় দিয়ে লোকটাকে বলে, “দারুন ঘোড়া।”

লোকটা বুঝতে পারে ও কি বলতে চাইছে। একগাল হেসে ঘোড়াটার পিঠে চাপড় মারে। কি যেন বলে। চম্বলও হেসে মাথা নাড়ে।

“আর পাঁচ মিনিট দিলে খেলাটা শেষ হত,” পল্টন অভিযোগ করে। তার প্রতিপক্ষ খুব একটা দুঃখ পেয়েছে বলে মনে হল না। পল্টন জিতছিলো বোধহয়।

“চল এখন, অনেক হয়েছে।” প্রত্যুষ ছাউনির পেছনের জংগলের দিকে এগোতে শুরু করে। বাকিরা ওর পিছু নেয়। “আমাদের মিশান সাকসেসফুল। ওই যে হাতিটা দেখলি চম্বল, আকবরের সৈন্যদের মধ্যে? ওটাই আকবরের হাতি। আমি দূরবীন দিয়ে আকবরকে দেখতে পেয়েছি। কিছু ঝোপঝাড়ের পাশে একটা জায়গায় তলোয়ারটা পোঁতা হয়েছিলো, যা বুঝলাম। যায়গাটা ম্যাপে দাগিয়ে নিয়েছি।””

“আকবর বুঝতে পেরেছে, যে তলোয়ার নেই?”

“একটা সোরগোল পরে গেলো, সেটা বুঝতে পারলাম। অনেকে উত্তেজিত হয়ে ছুটোছুটি করছিলো। তারপর আর দেখিনি।”

ছাউনির শেষে এক পাল মুরগি পেরিয়ে আবার সেই জঙ্গলটা। একটু ঢুকে গিয়ে দাঁড়ায় সবাই। প্রত্যুষ কান খাড়া করে শোনে কেউ আশপাশে আছে কিনা। তারপর কানের যন্ত্রটা বার করে লাগায়। বলে, “ফিল্ড টু কন্ট্রোল। উই আর রেডি টু কাম ব্যাক।”


Next chapter